ads

ad

গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভাল

‘’গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভাল’’
--স্বামী বিবেকানন্দের এই কথা বলে অনেকে বেশ রসাল মজা পান। তারা ভাবেন স্বামী বিবেকানন্দ যখন বলেছেন তখন তো  তা নিশ্চয়ই অভ্রান্ত। কাজেই তোমরা ফুটবলই খেলো, গীতাপাঠ নিষ্প্রয়োজন।
ফুটবল খেলার উল্লেখ এখানে একটা প্রতীকমাত্র। বিবেকানন্দ  শরীর চর্চাকে অনেক গুরুত্ব দিতেন। শরীর সুস্থ না থাকলে মনও সুস্থ থাকে না—এটা আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা। তাই সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন  নিয়ম করে  শরীরচর্চা করতে হয়।  শরীর চাঙ্গা থাকলে মনও চনমনে থাকে। তখন যে কোন কাজ ভালভাবে  এবং কম সময়ে করা যায়।
বিবেকানন্দ ছিলেন কর্মযোগী। শিবজ্ঞানে জীবসেবাই  ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। মানুষের মধ্যেই যে নারায়ণ আছেন তা তিনি শিখেছিলেন তাঁর গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণের কাছ থেকে। আপনাদের মনে আছে—নরেন্দ্রনাথ একদিন   শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে জানতে চান--  তাঁর মুক্তি হবে কিসে? শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে তিরস্কার করে বলে ছিলেন—‘দুশ্শালা, তুই এতো স্বার্থপর কেনে? কোথায়  মস্ত বটগাছের মতো হবি, কত পাপী তাপী তোর ছায়ায় বিশ্রাম নেবে। আর তুই শালা নিজের মুক্তি চাইছিস?’ (কথাটা একটু অন্যরকমও হতে পারে)
আপনারা জানেন—এরপর  নরেন্দ্রনাথের জীবনের গতি সম্পূর্ণ অন্যদিকে মোড় নিয়েছিল যার ফলস্বরূপ  আমরা স্বামী বিবেকানন্দকে পেয়েছি। স্বামীজি শাস্ত্রবাক্যের শুষ্ক কচকচানিতে  বিশ্বাস  করতেন না।  তাই তিনি যেমন নিজে অলস জীবনযাপন না করে সমাজের অবহেলিত, দলিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের জন্য নিজের জীবনকে যেমন উৎসর্গ করেছিলেন, তেমনি অন্যদেরও সেবাধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন।  তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন--  ‘তোরা  জন্ম থেকে মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।‘ মা মানে দেশমাতা।
স্বামী বিবেকানন্দ কিসের জন্য এই ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন? লোকে তাঁকে মান্য করবে, তাঁকে বাহবা দেবে, প্রশংসা করবে, ধর্মীয় নেতারূপে স্বীকার করবে, তাঁর নাম, যশ, খ্যাতি হবে—এই জন্য? আশা করি স্বামীজির অতি বড় শত্রুও  যদি কেউ থাকে সেও এই কথা মানবে না।
তাহলে আমরা স্বামীজির এই কাজকে কী বলব? এটাই নিষ্কাম কর্ম। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে, বহুজনহিতায় যে কর্ম তা  তো নিষ্কাম কর্মই। বিবেকানন্দ এই নিষ্কাম কর্মের ধারণা কিন্তু পেয়েছিলেন গীতা থেকেই। গীতায় যে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন—
‘সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
ত্বামহং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি।।‘

স্বামীজি সব কিছু ত্যাগ করে রামকৃষ্ণের শরণ  নিয়েছিলেন। জীবকে শিবজ্ঞানে সেবা করে তার মধ্যেই মুক্তির সন্ধান করেছিলেন।
মনে রাখতে হবে—নরেন্দ্রনাথ দর্শনের ছাত্র ছিলেন। ভারতীয় দর্শনে গীতাকে বেদান্ত দর্শনের স্মৃতিপ্রস্থানের গ্রন্থ বলা হয়। অদ্বৈত বেদান্ত  অনুসারে  ‘ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা, জীবই ব্রহ্ম, অন্য কিছু নয়।‘
ব্রহ্ম হল সর্ব বৃহৎ সত্ত্বা—the supreme reality.  মানুষ তার সাধনার বলে সেই ব্রহ্মত্ব লাভ করতে পারে। ব্রহ্মকে লাভ করলে মানুষ ব্রহ্মই হয়ে যায়। মানুষের ভেতরে যে অমিত সম্ভাবনা আছে তা অদ্বৈতবেদান্তে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমরা কবি চণ্ডীদাসের কথা স্মরণ করতে পারি—
‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।‘
আমার মনে হয় স্বামীজি অদ্বৈতবেদান্তের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং যখন দেখলেন শ্রীরামকৃষ্ণও বাংলা ভাষায় একইরকম কথা বলছেন তখন তাঁর সমস্ত সংশয় দূর হয়ে গিয়েছিল । তিনি  যেরকম ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতেন তাতে  মনে হয় শ্রীরামকৃষ্ণের কথাও  তিনি  যুক্তি দিয়ে বিচার করেই মেনে নিয়েছিলেন । স্বামী বিবেকানন্দকে প্র্যাক্টিক্যাল বেদান্তের প্রবর্তক বলা হয়।
আর একটা কথা—স্বামীজী শিকাগোতে বিশ্ব ধর্মসম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে আমাদের সমস্ত শাস্ত্রগ্রন্থ বেশ ভাল করে পড়েছিলেন। অসাধারণ মেধা ও মনঃ সংযোগের দ্বারা তিনি শাস্ত্রজ্ঞান ভালভাবে আত্মস্থও করেছিলেন। কাজেই স্বামীজি গীতাপাঠ বাদ দিয়ে যখন ফুটবল খেলতে বলেন তখন যে এর অন্য  একটা তাৎপর্য আছে সেই বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। স্বামীজী নিজেই তো তার প্রমাণ। অতএব বন্ধু, মহাপুরুষদের  বাণীর আক্ষরিক মানে  করলে যথেষ্ট  ভুল হওয়ারই সম্ভাবনা থাকে না কি?
আমরা সকলেই জগৎ ও জীবনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাই। শৈশব ও যৌবনে যে প্রশ্নগুলি নিয়ে আমরা ভাবি না, প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ বয়সে আমরা তা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। জীবন সম্বন্ধে আমাদের জিজ্ঞাসা জাগে—

আমি কে? কোথা থেকে এসেছি ? যাবই বা কোথায় ? আমার এই জন্মই কি শেষ, নাকি আরো কোন জন্ম আছে? জীবনে এত দুঃখ কে ? সুখ এত অল্প কেন ? যা চাই তা কেন পাই না? আমার সাধ মিটল না কেন? আমার আশা পূরণ হল না কেন? হাতের নাগালে পেয়েও সব ফসকে যায় কেন? ওরা কত ভাল আছে, আমি ভাল নেই কেন?
আশা করি এই প্রশ্নগুলির উত্তর আপনি গীতা থেকে পেয়ে যাবেন।
শেষ বয়সে অনেকে জীবনের ব্যাল্যান্স শীট মেলান—দেখেন  সারা জীবনের প্রাপ্তি একটা BIG ZERO. তাই তো জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে কেউ বললেন—
জীবনটা পেঁয়াজের মতো, খোসা ছাড়িয়ে যাও, শেষে দেখবে কিছুই নেই।
কেউ বললেন—Once I have been thrown down in this world and once I would be kicked out.
আমাদের আয়ু যদি ১০০ বছর ধরা যায় তাহলে প্রথম ৬০ বছর পর্যন্ত নিজেকে তৈরি করা, বিভিন্ন দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করা—এই সব করে করেই দেখবেন কখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এরপর কি আপনি ফুটবল নিয়ে মাঠে নামবেন?
ফুটবল খেলারও তো বয়েস আছে।  এতদিন তো নিজেকে নিয়ে ভাববার সময়ই পান নি। এবার যখন ভাবতে বসবেন দেখবেন—আপনি একেবারেই একা। আপনার স্বামী/স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সব আছে, তবু আপনি একা। আপনি নিজে একটু একা থেকে একাকী  ভেবে আমার কথাটা মিলিয়ে নেবেন। হয়তো বলবেন—মশাই এই সব গাঁজাখুরি গপ্প ছাড়ুন। সবার মধ্যে থেকে আবার কেউ একা থাকে নাকি? আপনার কথা শুনে তো মশাই আমার কানে ঘুম আসছে! যদি নিজেকে একা মনে হয় তাহলে তো কোন লোকই ঠিকমতো সংসার করতে পারবে না। সংসারে কোন বন্ধন থাকবে না। যে যার মতো চলবে। স্নেহ, প্রেম, ভালবাসা, মায়া, মমতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা –এইসব মানবিক গুণগুলির কী মূল্য থাকবে?
হ্যাঁ, আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন এবং তা যুক্তিসঙ্গতও  বটে। অথচ মজার ব্যাপার দেখুন সংসারে সবই আছে, অথচ আপনি একা। এ যেন সূর্যের গ্রহের মতো, কী অমোঘ টানে আমরা সংসারে ঘুরপাক খাচ্ছি! কখনো মনে হয় জীবনটা দুর্বিষহ, আবার জীবনে ভাল কিছু ঘটলে মনে হয়—
‘বেঁচে থাকাটা বেশ মন্দ না!’
বন্ধু, জীবনটা কেমন একটা মজার গোলকধাঁধা তাই না? এর প্রতি পরতে পরতে রস, মজা, বিস্ময়। সব মিলিয়ে একটা মহা বিস্ময়। এই বিস্ময়ের স্বাদ যদি না পান তবে জীবনটা আপনার কাছে মনে হবে—বিষময়। পার্থক্য শুধু ‘স’ আর ‘ষ’-এ।
জীবনের এই সামগ্রিক মজা কি আপনি শুধু ফুটবলে পাবেন?
এর মজা পেতে হলে যে আপনাকে সৎসঙ্গ করতে হবে, সৎ আলোচনা শুনতে হবে, সৎ চিন্তা করতে হবে, আর সঙ্গে একটু সময় বের করে আমাদের শাস্ত্র গ্রন্থগুলি পড়তে হবে। বেশী না একটা দুটো শ্লোক পড়ুন, নিজের মতো করে ভাবুন, ধীরে ধীরে attachment বাড়ান। আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন আপনার ভেতরে কী কী পরিবর্তন হচ্ছে। সময় থাকতেই শুরু করা ভাল। আমি পুণ্যকর্মের কথা বলছি না, নিজের ভাল থাকার জন্যই বইগুলি পড়া দরকার।
কাজেই বন্ধুরা, ফুটবলও খেলুন, গীতাও পড়ুন। দুটোতেই উপকার পাবেন। দুটোর মধ্যে কোন বিরোধ নেই।

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—