ads

ad

অকালবোধন ও কিছু কথা



 অকালবোধন ও কিছু কথা

অকাল মানে অনুপযুক্ত কাল, অরথাৎ অসময়। কালিকাপুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা রাতের বেলায় দেবীর বোধন করেছিলেন। দেবতার পূজার পক্ষে রাত তো অকালই। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে দেবীপূজার উপযুক্ত কাল হল বসন্তকাল।  চৈত্রমাসের শুক্লা ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত দেবীর বাসন্তী পূজার রীতি প্রচলিত। শাস্ত্র অনুসারে ছয়মাস উত্তরায়ণ দেবতাদের একদিন এবং ছয়মাস দক্ষিণায়ন এক রাত্রি। দক্ষিণায়ন শুরু হলে বিষ্ণু শয়ন করেন। একে বলে শয়ন একাদশী। দক্ষিণায়ন শেষ হলে বিষ্ণুর উত্থান হয় বা জেগে ওঠেন। একে বলে উত্থান একাদশী। দেবতারা উত্তরায়ণে জাগ্রত হন বিষ্ণুশক্তি বিষ্ণুমায়া দুর্গাও রাত্রিতে (দক্ষিণায়নে) নিদ্রিতা থাকেন। শরৎকাল দক্ষিণায়নে পড়ে। এই সময়ে দেবীর উদ্বোধন বা জাগানো হল অকালবোধন।  
বৈদিক যুগের কোন এক সময়ে শরৎকালে বর্ষগণনা শুরু হয়েছিল।  হয়তো শরতের শুরুতেই ধ্বংসের দেবতা রুদ্রের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করা হত। রুদ্রের  ধ্বংস-কাজে  সহায়তা করতেন তার বোন অম্বিকা। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এই শরৎকেই  অম্বিকা বলা হয়েছে—
শরদ্বাস্যাম্বিকা স্বসা। তয়া বা এষ হিনস্তি। 
যং হিনস্তি তয়ৈবৈনং সহ শময়তি।
 রুদ্রের সঙ্গে এই অম্বিকাকে যজ্ঞে পুরোডাশ ইত্যাদি দ্বারা তুষ্ট করলে তিনিই রুদ্রকে শান্ত করে ধ্বংস থেকে নিবৃত্ত করেন। রুদ্র তাঁর যে সকল  শত্রুকে ধ্বংস করতে চান, সেই অম্বিকা শরৎ-রূপ গ্রহণ করে  জ্বর প্রভৃতি নানারকম রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়ে শত্রুদের বিনাশ সাধন করেন।
শরৎকালে একসময় দেশে নানারকম রোগ হত। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভাল না থাকায় কোন কোন সময় দেশে মড়ক দেখা দিত। নতুন বৎসরের শুরুতেই এইরকম  দৈব দুর্বিপাকে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ত। তখন রুদ্রদেবতা এবং তাঁর বোন অম্বিকাকে তুষ্ট করার জন্য যজ্ঞ করতেন।
তারপর বর্ষগণনার রীতির পরিবর্তন হয়। কিন্তু প্রাচীনকালের যজ্ঞপ্রথার স্মৃতি  রয়ে যায়। শরতে বর্ষগণনা না হওয়ায় তা হয়ে যায় অকাল। রুদ্র-যজ্ঞের স্থান অধিকার করল রুদ্রের সহায়িকা শক্তির (অম্বিকার) পূজা। এই রুদ্রশক্তির পূজাই কালক্রমে দুর্গাপূজায় রূপান্তরিত হয়।
শরৎকালে যেহেতু বর্ষগণনা শুরু হত, তাই এটা আসলে নব বর্ষের উৎসব ছিল। তাই এই সময়ে ঘরদোর সাজানো, নতুন পোশাকপরিচ্ছদ পরা, ভাল ভাল খাওয়া-দাওয়া, আত্মীয় বন্ধুদের প্রীতি সম্ভাষণ, আলিঙ্গন, গুরুজনদের আশীর্বাদ গ্রহণ –এইগুলি তার অঙ্গ ছিল।
বাল্মীকি-রামায়ণে অকালবোধনের কোন উল্লেখ নেই। রামচন্দ্রের দ্বারা অকালবোধনের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ কাল্পনিক। রাম-রাবণের যুদ্ধ কোন ঋতুতে হয়েছিল তার কোন রকম উল্লেখ বাল্মীকির রামায়ণে দেখা যায় না।
শরৎকালে দেবী দুর্গার বোধন ও পূজাকে অকালবোধন বলা হয়। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে অকালে বা শরৎকালে রামচন্দ্র দেবীর পূজা করে তাঁকে সন্তুষ্ট করে বর লাভ করে দশমী তিথিতে রাবণকে বধ করে বিজয়ী হয়েছিলেন।  সেইজন্যই দশমী হল বিজয়া দশমী। দশেরা উৎসবও  রামের দ্বারা রাবণ-বিজয়ের উৎসব।   
কালিকাপুরাণে এবং বৃহদ্ধর্মপুরাণে দেবী দুর্গার অকালবোধনের কথা আছে—
রামস্যানুগ্রহার্থায় রাবণস্য  বধায় চ।                                রাত্রাবেব মহাদেবী ব্রহ্মণা বোধিতা পুরা।।                       ততস্তু ত্যক্তনিদ্রা সা নন্দায়ামাশ্বিনে সিতে।               জগাম নগরীং লংকাং যত্রাসীৎ রাঘবঃ পুরা।।
--পুরাকালে রামের অনুগ্রহের জন্য এবং রাবণবধের জন্য মহাদেবী রাত্রিতে ব্রহ্মার দ্বারা বোধিত হয়েছিলেন। তারপর তিনি  নিদ্রা ত্যাগ করে আশ্বিনের শুক্লপক্ষে যেখানে রাম আগে ছিলেন সেই লঙ্কাপুরীতে গিয়েছিলেন।
এরপর রাবণ নিহত হলে সমস্ত দেবতার সঙ্গে পিতামহ ব্রহ্মা দুর্গাদেবীর বিশেষ পূজা করেছিলেন—নিহতে রাবণে নবম্যাং সকলৈঃ সুরৈঃ ।                           বিশেষপূজাং দুর্গায়াশ্চক্রে  লোকপিতামহঃ।।
এখানে দেখা যাচ্ছে দেবী দুর্গার পুজো ব্রহ্মা করেছিলেন, রামচন্দ্র করেন নি। বৃহদ্ধর্মপুরাণেও  (পূর্ব খণ্ড) ব্রহ্মার দ্বারা দেবীর  বোধনের কথা বলা হয়েছেব্রহ্মা পুরোহিতরূপে প্রার্থনা করছেন—
ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে তু শিবে বোধস্তব দেব্যাঃ কৃতো ময়া।। 
তস্মাদদ্যাদ্রয়া যুক্ত নবম্যামাশ্বিনে শুভে।
রাবণস্য বধং   যাবদর্চয়িষ্যামহে  বয়ম্।।
--রাবণের বধ এবং রামের অনুগ্রহ লাভের জন্য হে শিবে, আমি তোমার বোধন করছি। অতএব শুভ আশ্বিন মাসের আদ্রা নক্ষত্রযুক্ত তিথিতে রাবণের বধ পর্যন্ত আমরা তোমার পুজো করব।
দেবী বলেছিলেন-- 
প্রথমে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা নবমী থেকে শুক্লাষ্টমী পর্যন্ত  (১৫ দিন) বিল্ববৃক্ষে  (বেলগাছে)  তাঁর পুজো করতে হবে এবং সপ্তমীতে বাড়িতে এনে  থেকে  নবমী পর্যন্ত  তাঁর পুজো করতে হবে। কবি কৃত্তিবাস বলেছেন—
সায়াহ্ন কালেতে রাম করিল বোধন।
আমন্ত্রণ অভয়ার বিল্বাধিবাসন।।
কবি কৃত্তিবাস ১০৮ টি নীলপদ্ম দ্বারা দুর্গা পূজার  বর্ণনা  দিয়েছেন।
এই অকালবোধনের স্মৃতি হিসাবেই বঙ্গে  দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয়।
রামচন্দ্রের অকালবোধনের আগে ব্রহ্মাও দুর্গার স্তব বা পুজো করেন নি। রামচন্দ্র আদিত্য বা সূর্যের স্তব করেছিলেন। রামায়ণের যুগে দেবী হিসাবে দুর্গা বা চণ্ডীর রূপ কল্পিত হয় নি। সম্ভবতঃ  দুর্গা-চণ্ডী সূর্য ও অগ্নির তেজের সমন্বয় বলেই  সূর্যপূজার জায়গায় দুর্গাপূজার রীতি প্রচলিত হয়েছিল।
বাঙ্গালীর দুর্গা পূজাতে বৈদিক, পৌরাণিক, তান্ত্রিক, লৌকিক প্রভৃতি বিচিত্র রীতি পদ্ধতির মিশ্রণ ঘটেছে। ফলে সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
ষষ্ঠীতে  সন্ধ্যার সময় দেবীর আবাহন, বোধন, অধিবাস ইত্যাদি হয়ে থাকে। শাস্ত্রমতে বেলগাছে বা বেলগাছের ডালে দেবীর বোধন হয়। সপ্তমী থেকে নবমী  পর্যন্ত প্রতিমায় দেবীর পূজা হয়।  সপ্তমীতিথিতে নবপত্রিকা-প্রবেশ নামে একটি অনুষ্ঠান হয়। নবপত্রিকা আসলে নয়টি উদ্ভিদ—কদলী (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মান ও ধান। পাতাযুক্ত একটি কলাগাছে  আবশিষ্ট আটটি  মূল-পাতা-ডাল সহ উদ্ভিদ একত্র করে এক জোড়া বেলসহ  সাদা অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে  লালপাড় সাদা  শাড়ী  জড়িয়ে ঘোমটা পরিয়ে  সিঁদুর মাখিয়ে দেবীর ডানদিকে গণেশের পাশে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। লোকে এটাকে  কলাবউ, বা গণেশের বউ বলে। আসলে উক্ত নয়টি উদ্ভিদ দেবী দুর্গারই প্রতিরূপ। এই নবপত্রিকা নবদুর্গা নামে পূজিত হয়। এই নয়টি রূপ হল— ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা, কার্তিকী, শিবা, রক্তদন্তিকা,  শোকরহিতা, চামুণ্ডা ও লক্ষ্মী।
দুর্গা পূজার আর একটি ব্যাপার কুমারীপূজা।  এটা তান্ত্রিক প্রভাব।  সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীঅ্যাই তিনদিন দেবীর পূজাশেষে  কোন কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা পরা হয়। বৃহদ্ধর্মপুরাণ অনুসারে দেবতাদের স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যারূপে  তাঁদের সামনে আবির্ভূত হন এবং বেলগাছে তাঁর বোধন করতে বলেন।
দেবীপুরাণ –মতে দেবীর পূজার পর কুমারীদের শালিধানের চালের ভাত, মিষ্টান্ন ইত্যাদি   নৈবেদ্য  দ্বারা কুমারীদের ভোজন করাতে হবে।
তন্ত্রসারে  মহানবমীতে কুমারীপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে।  ১ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বালিকারা ঋতুমতী না হওয়া পর্যন্ত কুমারীরূপে  পূজা করার যোগ্য। একবছরের কন্যাকে বলা হয় সন্ধ্যা, ২ বছরের কন্যাকে বলে সরস্বতী, ৩ বছরের কন্যাকে বলে ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কন্যা হল কালিকা, ৫ বছরের কন্যা সুভগা,  ৬ বছরের কন্যা উমা, ৭ বছরের কন্যা মালিনী, ৮ বছরের কন্যা কুব্জিকা, ৯ বছরের কন্যা কালসন্দর্ভা, ১০ বছরের কন্যা অপরাজিতা, ১১ বছরের কন্যা রুদ্রাণী, ১২ বছরের কন্যা ভৈরবী, ১৩ বছরের কন্যা মহালক্ষ্মী, ১৪ বছরের কন্যা পীঠনায়িকা, ১৫ বছরের কন্যা ক্ষেত্রজ্ঞা, ১৬ বছরের কন্যা কুমারী  অম্বিকা। 
দেবী মহাশক্তিকে কুমারী বলার একটা অন্য তাৎপর্য আছে।  দেবতাদের তেজঃপুঞ্জ থেকে জাত চণ্ডী কুমারী। তিনি শিবের পত্নী, বা কার্ত্তিক, গণেশের জননী নন। বৃহদ্ধর্মপুরাণ (পূর্বখন্ড) অনুসারে ব্রহ্মাসহ দেবতারা পৃথিবীতে এসে একটি নির্জন  স্থানে বেলগাছের  একটি পাতায় তপ্তকাঞ্চবর্ণা  একটি সুন্দরী, নবজাতা  বালিকাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পান। দেবতাদের স্তবে জাগ্রত হয়ে সেই বালিকা উগ্রচণ্ডা নামে এক যুবতীতে রূপান্তরিত হলেন। ইনিই দেবী চণ্ডিকা।

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—