ads

ad

৩. প্রাচীনভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy )



. প্রাচীনভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy )
উত্তর
ভূমিকাপ্রাচীন ভারতবর্ষের বিজ্ঞানশাখার প্রধান দিক জ্যোতির্বিদ্যা গ্রহ-নক্ষত্র সম্বন্ধে তথ্যানুসন্ধান এর মূল বিষয় বৈদিক যাগযজ্ঞের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, অমাবশ্যা, পূর্ণিমা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যের উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ন প্রভৃতি জানার প্রয়োজন হত কৃষিকাজের জন্য ঋতু, বৃষ্টিপাত, আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি প্রভৃতি জানারও প্রয়োজন ছিল এই উভয়বিধ প্রয়োজন সিদ্ধির জন্য জ্যোতির্বিদ্যার উদ্ভব
প্রাচীনযুগের জ্যোতির্বিদ্যা—
জ্যোতির্বিদ্যার প্রাচীন  নিদর্শন জ্যোতিষ বেদাঙ্গ। এর কাল আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। গ্রন্থটি ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদের  অন্তর্গত। ঋগ্বেদ অংশে ৪৩টি এবং যজুর্বেদ অংশে ৩৬টি অধ্যায় আছে।  
প্রধানতঃ যুগের আবর্তন, চন্দ্র-সূর্যের গতি, অমাবশ্যা, পূর্ণিমা, গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতির আলোচনা এখানে আছে।
অথর্বন্‌ জ্যোতিষ নামে অথর্ববেদের পৃথক্‌ জ্যোতিষ গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া গার্গীসংহিতা, বৃদ্ধগর্গসংহিতা, পুষ্করসাদিন্‌, নক্ষত্রদীপিকা, পৈতামহসিদ্ধান্ত প্রভৃতি গ্রন্থের নামও পাওয়া যায়। উক্ত রচনাগুলি বর্তমানে লুপ্ত।
মধ্যযুগের জ্যোতির্বিদ্যা—
মধ্যযুগেই ভারতবর্ষে Scientific Astronomy বা বৈজ্ঞানিক জ্যোতির্বিদ্যার উদ্ভব হয়। Scientific Astronomy কে চারভাগে ভাগ করা যায়। Winternitz এই ভাগগুলি সম্বন্ধে বলেছেন--
1. Siddhanta, manuals in which complete systems of astronomy is presented;
2. The Karanas, works that are meant to serve as introductions;
3. Works with Astronomical Tables, that simply calculations;
4. The numerous commentaries on the earlier works that often contain valuable quotations from works that are now lost.
জ্যোতির্বিদ্যার প্রধান দুটি ভাগ— গণিত ও ফলিত জ্যোতিষ। জ্যোতির্বিদ্যার প্রধান বিষয়গুলি গণিতের উপর নির্ভরশীল এবং ফলিত জ্যোতিষের কিছু বিষয় জ্যোতির্বিদ্যার অন্তর্গত।
জ্যোতির্বিদ্যার প্রধান প্রধান আচার্য এবং তাঁদের গ্রন্থাবলী—
প্রথম আর্যভট বা আর্যভট্ট—
ভারতে Scientific Astronomy বা বৈজ্ঞানিক জ্যোতির্বিদ্যার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আর্যভট (পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দ)। ইনি বৃদ্ধ আর্যভট্ট এবং সর্বসিদ্ধান্তগুরু নামে পরিচিত। ইনিই প্রথম পৃথিবীর আহ্নিক গতির তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। অনেক পরবর্তীকালে পাশ্চাত্ত্য জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস এইরকম সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করেন।
আর্যভট-রচিত গ্রন্থের নাম আর্যভটীয় বা লঘ্বার্যভটীয় বা আর্যসিদ্ধান্ত। এর শেষ তিনটি অংশ আর্যাষ্টশতক নামে পরিচিত। গ্রন্থের চারটি ভাগ ও তাদের বিষয়বস্তু যথাক্রমে—
১. দশগীতিকাসূত্র--  এই অংশে সংখ্যাগণনার এক অভিনব পদ্ধতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২. গণিতপাদ--  এই গ্রন্থে ৩৩টি আর্যা ছন্দে রচিত শ্লোকে গণিতশিক্ষার নির্দেশাবলী আছে।
৩. কালক্রিয়াপাদ-- ২৫টি শ্লোকে রচিত এই গ্রন্থে জ্যোতির্বিদ্যাগত কাল গণনার মূল নীতিসমূহ লিপিবদ্ধ আছে।
৪. গোলপাদ-- এখানে ৫০টি শ্লোকে বৃত্ত সম্বন্ধে আলোচনা আছে।
লাট--  আলবেরুণীর মতে লাট-রচিত গ্রন্থের নাম সূর্যসিদ্ধান্ত। এখানে ১৪টি অধ্যায় আছে। বরাহমিহির তাঁর পঞ্চসিদ্ধান্তিকাতে সূর্যসিদ্ধান্তের বিষয়বস্তুর বিবরণ দিয়েছেন।
বরাহমিহির লাট, সিংহ, প্রদ্যুম্ন, বিজয়নন্দী এবং আর্যভট্টের নাম করেছেন।
দ্বিতীয় আর্যভট্ট-- এই আর্যভট্টের গ্রন্থের নাম আর্যসিদ্ধান্ত। আলবেরুণী দুজন আর্যভট্টের কথা বলেছেন। ভাস্করাচার্যও দ্বিতীয় আর্যভটের কথা জানতেন।
লল্ল--  বৃদ্ধ আর্যভটের শিষ্য লল্ল-রচিত গ্রন্থের নাম শিষ্যধীবৃদ্ধিদতন্ত্র। শিষ্যদের বুদ্ধি বৃদ্ধির জন্য এই গ্রন্থটি রচিত। এর উপর ভাস্করের টীকা আছে।
বরাহমিহির-- আর্যভটের পরবর্তী বিখ্যাত আচার্য বরাহমিহির। তাঁর কাল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক।  তাঁর গ্রন্থের নাম পঞ্চসিদ্ধান্তিকা। এটি জ্যোতির্বিদ্যার করণ পর্যায়ের রচনা। এই গ্রন্থে তৎকালে প্রচলিত পাঁচটি সিদ্ধান্ত-- সূর্যসিদ্ধান্ত, রোমকসিদ্ধান্ত, পৌলিশসিদ্ধান্ত, পৈতামহসিদ্ধান্ত ও বশিষ্ঠসিদ্ধান্ত আলোচিত হয়েছে।লাটদেব পৌলিশসিদ্ধান্তের উপর টীকা রচনা করেছেন।
ব্রহ্মগুপ্ত--  বরাহমিহিরের পরবর্তী আচার্য ব্রহ্মগুপ্ত। ৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর আবির্ভাব। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত। পরবর্তী টীকাকারদের মতে গ্রন্থটি পৈতামহসিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে রচিত।ব্রহ্মগুপ্ত সূর্যসিদ্ধান্তের অনেক মতের বিরোধিতা করেছে। তিনি জ্যোতির্বিদ্যার অনেক জটিল সমস্যার সমাধানও করেছেন। গণিতবিদ হিসাবে তাঁর স্থান একেবারে প্রথম সারিতে।ভাস্করাচার্য তাঁকে ‘গণকচক্রচূড়ামণি’ বলেছেন।
ভাস্করাচার্য--  সর্বশেষ বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ভাস্করাচার্য। তাঁর কাল ১১১৪ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থের নাম সিদ্ধান্তশিরোমণি। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ করণকুতূহল।
সিদ্ধান্তশিরোমণির চারটি অধ্যায়-- লীলাবতী, বীজগণিত, গ্রহগণিতাধ্যায় ও গোলাধ্যায়।
প্রথম দুটি অধ্যায়ে গণিত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গোলাধ্যায়ে পৃথিবীর গোলত্ব ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
সিদ্ধান্তশিরোমণির উপর তিনটি টীকা রচিত হয়েছে। যথা—বাসনাভাষ্য, বাসনাবার্তিক ও মরিচিতিকা।
ব্রহ্মগুপ্ত ও ভাস্করাচার্যের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত কিছু জ্যোতির্বিদ্যার গ্রন্থ পাওয়া যায়। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য-- ভোজ-রচিত রাজমৃগাঙ্ক, শতানন্দের ভাস্বতী, মকরন্দ-রচিত তিথ্যাদিপত্র, গণেশের গ্রহলাঘব বা সিদ্ধান্তরহস্য, কমলাকরের সিদ্ধান্ততত্ত্ববিবেক প্রভৃতি।
জ্যোতির্বিদ্যার অন্যান্য গ্রন্থ—
প্রথম ভাস্করের মহাভাস্করীয়ম্‌, দ্বিতীয় ভাস্করের লঘুভাস্করীয়ম্‌, মঞ্জুলের লঘুমানস, মহেন্দ্রসূরির যন্ত্ররাজ, পরমেশ্বরের গোলদীপিকা, অচ্যুতের রাশিগোলস্ফুটানীতি, নীলকণ্ঠ সোমযাজীর সিদ্ধান্তদর্শন, নারায়ণ ও হয়ৎ এর গ্রহাচারনিবন্ধন, বীজগণিত। এগুলি সম্ভবতঃ আরবী জ্যোতির্বিদ্যা গ্রন্থের সংস্কৃতানুবাদ।
উপসংহার-- ভারতবর্ষের Scientific Astronomy-র ধারণা ধার করা নয়, এটা সম্পূর্ণরূপে ভারতবর্ষের নিজস্ব। গ্রহের আবর্তন গতির ধারণায় ভারতবর্ষের নিজস্বতার অনেক প্রমাণ আছে। প্রাগ্‌বৈদিক যুগ থেকেই আমাদের দেশের চিন্তাবিদগণ এ নিয়ে বিচার-বিমর্শ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সেই পদ্ধতি গুরু-শিষ্যপরাম্পরাক্রমে চলেছে এবং কালক্রমে কিছু হারিয়েও গেছে।পরবর্তীকালে আর্যভট্ট, বরাহমিহির প্রমুখ প্রথিতযশা জ্যোতির্বিদগণ অবশিষ্ট কিছু প্রাচীন জ্ঞান এবং গ্রীক ও বেবিলনীয় জ্যোতির্বিদ্যার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁদের হাত ধরেই ভারতবর্ষে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার প্রসার ঘটেছে –একথা আজ নিঃসন্দেহে বলে যায়।

----

৪. সংস্কৃত বিজ্ঞান-ভিত্তিক সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা । জ্যোতির্বিদ্যার জগতে আর্যভট,  বরাহমিহির ও ব্রহ্মগুপ্তের অবদান—
উত্তর— বিজ্ঞানের দুটি প্রধান শাখা--  শুদ্ধবিজ্ঞান (Pure Science) ও বিবরণাত্মক বিজ্ঞান (Descriptive Science)শুদ্ধবিজ্ঞান-- গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন প্রভৃতি। বিবরণাত্মক বিজ্ঞান প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূবিদ্যা প্রভৃতি।প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যকে কয়েকটি প্রধানভাগে ভাগ করা যায়। যেমন—
১. চিকিৎসাশাস্ত্র (Medical science)
২. জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy)
৩. গণিতবিদ্যা (Mathematics)
৪. কিমিয়াবিদ্যা (Alchemy)
৫. রসায়নবিদ্যা (Chemistry)
৬. ধাতুবিদ্যা (Metallurgy)
৭. সুরাপাতনবিদ্যা (Distillation of liquor)
৮. রত্নবিদ্যা (Science of gems)
৯. প্রাণিবিদ্যা (Zoology)
১০. পক্ষিবিজ্ঞান (Ornithology)
১১. কৃষিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যা (Agriculture & Horticulture)

আর্যভট—
আর্যভট ভারতে Scientific Astronomy বা বৈজ্ঞানিক জ্যোতির্বিদ্যার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা তাঁর আবির্ভাবকাল পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দআলবেরুণীর বিবরণ অনুসারে আর্যভট কুসুমপুরের অধিবাসী ছিলেন। গ্রীক ঐতিহাসিকগণ তাঁকে ‘অর্‌দুরিবেরিয়স্‌’ বলেছেন। ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় আর্যভটকে  ‘বৃদ্ধ আর্যভট’ এবং ‘সর্বসিদ্ধান্তগুরু’ বলা হয়।। তিনিই প্রথম ‘ভূভ্রমণবাদ’ বা দিনরাত্রির আবর্তনের কারণরূপে পৃথিবীর আহ্নিক গতির তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। অনেক পরবর্তীকালে খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে পাশ্চাত্ত্য জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস অনুরূপ সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করেন।
আর্যভট-রচিত গ্রন্থের নাম আর্যভটীয় বা লঘ্বার্যভটীয় বা আর্যসিদ্ধান্ত। এর শেষ তিনটি অংশ আর্যাষ্টশতক নামে পরিচিত। গ্রন্থের চারটি ভাগ ও তাদের বিষয়বস্তু যথাক্রমে—
১. দশগীতিকাসূত্র--  এই অংশে সংখ্যাগণনার এক অভিনব পদ্ধতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২. গণিতপাদ--  এই গ্রন্থে ৩৩টি আর্যা ছন্দে রচিত শ্লোকে গণিতশিক্ষার নির্দেশাবলী আছে
৩. কালক্রিয়াপাদ-- ২৫টি শ্লোকে রচিত এই গ্রন্থে জ্যোতির্বিদ্যাগত কাল গণনার মূল নীতিসমূহ লিপিবদ্ধ আছে।
৪. গোলপাদ-- এখানে ৫০টি শ্লোকে বৃত্ত সম্বন্ধে আলোচনা আছে।
আর্যভটের সাক্ষাৎ শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন--  পাণ্ডুরঙ্গস্বামী, লাটদেব ও নিঃশঙ্ক। ভাস্করাচার্যকেও তাঁর শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারে। আর্যভট জ্যোতির্বিদ্যার দুটি প্রধান পদ্ধতির আলোচনা করেছেন— ঔদয়িকা ও অর্ধরাত্রিকা।
খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে আর একজন আর্যভটের নাম পাওয়া যায়। তাঁর রচিত গ্রন্থের নামও আর্যসিদ্ধান্ত।আলবেরুণী এই আর্যভটের নাম উল্লেখ করেছেন।
আর্যভটের অবদান—
আর্যভটের অবিস্মরণীয় অবদান হল তিনটি— এক. অনির্ণেয় সমীকরণ বা দিওফান্‌তীয় সমীকরণের সমাধান, দুই. π (পাই) এর মাননির্ণয়, এবং তিন. ত্রিকোণমিতির আলোচনা। তিনি সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের আবর্তন, তাদের মন্দোচ্চ পাতসমূহ নির্দেশ করেছেন। এছাড়া পরিবৃত্ত ও উৎকেন্দ্রিক বৃত্তের সাহায্যে গ্রহগতির ব্যাখ্যা, ত্রিকোণমিতির জ্যার্ধ ও তার মান, বর্গমূল ও ঘনমূল নির্ণয়ের পদ্ধতি, বৃত্তের পরিধির সঙ্গে ব্যাসের সঠিক অনুপাত, সমান্তর শ্রেণীর যোগফল এবং প্রাকৃত সংখ্যার (১ প্রভৃতি) বর্গ ও ঘনসমূহের যোগফল নির্ণয় প্রভৃতিও তিনি করেছেন। আর্যভট সংস্কৃত বর্ণমালার অক্ষরগুলির নির্দিষ্ট মান বিন্যাস করে তার দ্বারা সংখ্যা গণনার এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এবং তার প্রয়োগ করেন।আর্যভটের অবদান সম্বন্ধে Winternitz বলেছেন— Aryabhaa is perhaps the first or one of the first scholars to put together in a neat form the system that had developed in the Siddhāntas and improved some of its parts.....He was original to the extent that he declared the daily revolution of the celestial sphere only as apparent and assumed the revolution of the earth about its axis as real.

বরাহমিহির—
আর্যভটের পরবর্তীকালে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষী বরাহমিহির। ইতিহাসে দুজন বরাহমিহিরের নাম পাওয়া যায়। প্রথমজনের আবির্ভাব ২০০ খ্রিষ্টাব্দে এবং দ্বিতীয় জনের আবির্ভাব আনুমানিক ৫০৫ খ্রিষ্টাব্দে। দুজনেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষী। প্রথমজন সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। দ্বিতীয় বরাহমিহিরই জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষীরূপে সবিশেষ খ্যাত। তিনি ছিলেন মগধী ব্রাহ্মণ। পিতার কাছেই তাঁর শিক্ষা। প্রথম খ্রিষ্টাব্দে ইরানের অগ্নি উপাসক এক সম্প্রদায় উত্তর ভারতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরে এরা ব্রাহ্মণ্যধর্মে দীক্ষিত হন। বরাহমিহির এদেরই বংশধর বলে কথিত।
বরাহমিহির-রচিত গ্রন্থ—
বরাহমিহির-রচিত দশটি পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলি হল—
১. পঞ্চসিদ্ধান্তিকা, ২. বৃহৎসংহিতা, ৩. সমস্যা সংহিতা, ৪. ভটকণিকা, ৫. বৃহজ্জাতক, ৬. লঘুজাতক, ৭. বৃহৎযাত্রা, ৮. যোগযাত্রা, ৯. ত্রিকোণিকযাত্রা এবং ১০. বিবাহপটল।
বৃহৎসংহিতা-- জ্যোতিষশাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বৃহৎসংহিতা। এখানে তন্ত্র, হোরা ও সংহিতা নামে তিনভাগে গণিত, গণিত জ্যোতিষ ও ফলিত জ্যোতিষ আলোচিত হয়েছে।তৎকালীন ভারতবর্ষে অনুশীলিত সমস্ত রকম বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার সঙ্কলন এই গ্রন্থটি। এখানে রবি প্রভৃতি অষ্ট গ্রহের এবং সপ্তর্ষি, ধূমকেতু প্রভৃতির রাশি সঞ্চরণের ফল, গ্রহসমাগমের ফল, বর্ষফল, শস্যফল, আবহবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা,  ভূবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা, আয়ুর্বেদ, বাণিজ্য, অঙ্গবিদ্যা, মুহূর্তবিদ্যা, জাতকশাস্ত্র, স্থাপত্য, পূর্তকর্ম প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।এখানে সাবান তৈরি, এমন কি বারুদ তৈরির প্রণালীও বর্ণিত হয়েছে। বরাহমিহির ‘বজ্রলেপ’ নামে সিমেন্ট জাতীয় দ্রব্যের কথা বলেছেন যা সেইসময়ে মন্দির নির্মাণ এবং নানারকম স্থাপত্যকর্মে ব্যবহৃত হত। তিনি অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, পরিমিত বৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা করার সময় বৃষ্টিমাপক যন্ত্রের কথা বলেছেন। এই গ্রন্থে পরমাণুর আকার সম্বন্ধেও আলোচনা করা হয়েছে।
সমাস সংহিতা--  জ্যোতিষ-বিষয়ক একটি ছোট গ্রন্থ। এখন দুষ্প্রাপ্য। এ. এম. শাস্ত্রী তাঁর ‘Contribution towards the reconstruction of the Samasa Sanhita of Varahamihira’  প্রবন্ধে এই পুঁথি থেকে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এর উৎস জানা যায় নি।
ভটকণিকা--  এর বিষয় জ্যোতিষ। পুঁথিটি এখন দুষ্প্রাপ্য। অধ্যাপক P.V. Kane  তাঁর ‘The Vatakanika of Varahamihira’ প্রবন্ধে এই গ্রন্থ থেকে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন, কিন্তু সেগুলির উৎস সম্বন্ধে কিছু বলেন নি।
বৃহজ্জাতক--  এই গ্রন্থে নবজাতকের জন্মকালের কোষ্ঠী, ঠিকুজি প্রস্তুত প্রণালী এবং ভাগ্য গণনার পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে। টীকাকার উৎপলের মন্তব্যসহ পুঁথিটি ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বোম্বাই থেকে প্রকাশিত হয়।
লঘুজাতক-- বৃহজ্জাতকের ক্ষুদ্রতর সংস্করণ এই গ্রন্থটি। উৎপলের টীকাসহ আলবেরুণী এটি আরবীতে অনুবাদ করেন। এটি ‘India গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এর হিন্দি অনুবাদ ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে বোম্বাই থেকে প্রকাশিত হয়।
বিবাহপটল-- বহুল প্রচারিত ও পঠিত গ্রন্থ। বরাহমিহির দুটি পৃথক খণ্ডে বিবাহের শুভাশুভ মুহূর্ত থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পুঁথিটি বরদার সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে।
বৃহৎযাত্রা-- এই গ্রন্থটি যুদ্ধ-বিগ্রহ বিষয়ক জ্যোতিষের প্রধান গ্রন্থ। এর উপর উৎপলের টীকা আছে।
যোগযাত্রা-- যুদ্ধবিগ্রহ বিষয়ক একটি সংক্ষিপ্ত পুঁথি। এখানে প্রধানতঃ রাজাদের যুদ্ধযাত্রার শুভ মুহূর্ত সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
মূল্যায়ন-- বরাহমিহির প্রাচীন ভারতে জ্যোতিষ চর্চার পথিকৃৎ। জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের অনেক বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর মতে রাজার পক্ষে জ্যোতিষী অপরিহার্য। তিনি ছদ্মজ্যোতিষী থেকেও সাবধান হতে বলেছেন। বরাহমিহিরের অবদান সম্বন্ধে A. B. Keith বলেছেন--  We need not doubt that the text-book of astrology were numerous, and in fact Varāhamihira, whose great work causes all the older text disappear, mentions Asita, Devala, Garga, Vddha Garga, Nārada, and Parāśara among authorities.

----

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—