ads

ad

৪. মনুসংহিতা, ৫. যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা— (C-9, Unit II)


. মনুসংহিতা  (C-9, Unit II)
(প্রাচীনভারতস্য সামাজিক-রাজনৈতিক-বিধিবিধান-রীতি-নীতি-বিষয়ে মনুসংহিতায়াঃ গুরুত্বম্‌ আলোচয়ত)।

প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার এক মূল্যবান্‌ গ্রন্থ মনুসংহিতা। গ্রন্থটি স্মৃতিশাস্ত্রের অন্তর্গতএকে ধর্মশাস্ত্রও বলা হয়। বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের সাহায্যে পণ্ডিতগণ অনুমান করেছেন খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ থেকে তৃতীয় শতকের মধ্যে মনুসংহিতা রচিত হয়েছিল। মনুসংহিতার প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে বলা হয়েছে--  ‘ইতি মানবে ধর্মশাস্ত্রে ভৃগুপ্রোক্তায়াং মনুসংহিতায়াম্‌’। এ থেকে মনে হয়-- মনুশিষ্য ভৃগু মনুর উক্তির কিছু সংস্কারসাধন করে মনুসংহিতার পূর্ণরূপ দান করেন।

মনুসংহিতার বিষয়বস্তু-- সমগ্র মনুসংহিতা বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত।
প্রথম অধ্যায়--  এই অধ্যায়ের মূল বিষয়--  মনুর কাছে ঋষিদের ধর্মজিজ্ঞাসা, জগৎ ও জাগতিক বস্তুর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া, মহাপ্রলয়-বর্ণনা, সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলিযুগের পরিমাণ, ব্রাহ্মণাদি বর্ণের কর্ম প্রভৃতি।
দ্বিতীয় অধ্যায়--  ধর্মানুষ্ঠানপ্রকরণ। এই অধ্যায়ে ধর্মের লক্ষণ ও প্রমাণ, আর্যদের বাসভূমি, ব্রাহ্মণাদি বর্ণের সংস্কার, গুরু-শিষ্যের কর্তব্য, ইন্দ্রিয়জয়, বেদাধ্যয়নবিধি, ব্রহ্মচারীর কর্তব্য ও জীবনযাত্রা, মান্যতা, আচরণবিধি, গুরুসেবা, গুরুদক্ষিণা প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে
তৃতীয় অধ্যায়--  এই অধ্যায়ে ব্রহ্মচারীর অধ্যয়নকাল, সমাবর্তন, আট প্রকার বিবাহ, সবর্ণ ও অসবর্ণ বিবাহ, গৃহস্থের ধর্ম, পিতৃকার্য প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়-- এখানে  ব্রহ্মচর্য ও গার্হস্থ্য আশ্রমের বিবরণ, দ্বিজাতির বৃত্তি-নির্ধারণ, অধ্যয়ন-প্রসঙ্গ, অধ্যয়নের কাল ও নিয়ম, বিদ্যাদানের ফল, দানগ্রহণের পাত্র-অপাত্র-বিচার, অসত্য ভাষণের নিন্দা, আচারবান্‌ এর প্রশংসা প্রভৃতি।
পঞ্চম অধ্যায়--  ভক্ষ্য ও অভক্ষ্য দ্রব্য, অশৌচ, দ্রব্যশুদ্ধি,  স্ত্রীধর্ম প্রভৃতি এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়-- আশ্রম ধর্মানুসাসন। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস এই চার আশ্রমের ধর্ম এখানে আলোচিত হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়--  রাজধর্ম। রাজার উৎপত্তি, তাঁর কর্তব্য, রাজার সহায়রূপে দণ্ডের সৃষ্টি, সচিব, মন্ত্রী, দূত, সেনাপতি প্রভৃতি নিয়োগ, ছয় প্রকার দুর্গ,  করনীতি, যুদ্ধযাত্রা, রাজার আত্মরক্ষা প্রভৃতি বিষয় এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
অষ্টম অধ্যায়--  রাষ্ট্রনীতি। এই অধ্যায়ে ঋণাদান, নিক্ষেপ, অস্বামিবিক্রয়, সম্ভূয়সমুত্থান, সীমাবিবাদ, বাক্‌পারুষ্য, দণ্ডপারুষ্য, স্তেয়, সাহস প্রভৃতি ১৮টি বিবাদের বিষয়, বিবাদ-নিষ্পত্তি, বিচারের নীতি, সাক্ষ্য, বাণিজ্যশুল্ক, করছাড়, অন্যায়ভাবে বাণিজ্যকারীর দণ্ড প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
নবম অধ্যায়--  স্ত্রীপুরুষের ধর্ম, স্ত্রীলোকের রক্ষাবিধান, কন্যার বিবাহ-ব্যবস্থা, পৈতৃক ধনবিভাগ, পিতার ধনে পুত্রের অধিকার, স্ত্রীধন, একান্নবর্তী পরিবারের ধনবিভাগ, উৎকোচ গ্রহণকারীর দণ্ড, চোরের শাসন, বৈশ্য ও শূদ্রের ধর্ম প্রভৃতি এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
দশম অধ্যায়--  অসবর্ণ বিবাহে সঙ্কর জাতির উৎপত্তি, আপৎকালে চার বর্ণের বৃত্তি প্রভৃতি এই অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়।
একাদশ অধ্যায়-- প্রায়শ্চিত্তবিধি। সুরাপান, গো-হত্যার প্রায়শ্চিত্ত, বিভিন্ন ধরনের চুরির প্রায়শ্চিত্ত, অভক্ষ্য ভক্ষণের প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি এখানে আলোচিত হয়েছে।
দ্বাদশ অধ্যায়--  মোক্ষধর্ম। কর্ম অনুসারে জীবের মানবদেহ ধারণ, ফলভোগ, সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ গুণের স্বরূপ ও কার্য, জ্ঞান, ইন্দ্রিয়সংযম, অহিংসা, গুরুসেবা প্রভৃতি বিষয় এখানে আলোচিত হয়েছে।

মূল্যায়ন--  মনুসংহিতা প্রাচীন ভারতের ধর্মনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক রীতি-নীতি, আচরণবিধি প্রভৃতি সংক্রান্ত এক মূল্যবান্‌ গ্রন্থ। মনু গৃহস্থধর্মকে অত্যন্ত বড় বলেছেন। তিনি লোকব্যবহার সম্বন্ধে যা বলেছেন তা যে কোন সমাজেই প্রাসঙ্গিক। ভদ্র ব্যবহার, সত্য ও প্রিয় কথা বলা, তোষামোদ না করা, বিবাদ বা শত্রুতা না করা, আলস্য ত্যাগ করা, সকলের প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন হওয়া প্রভৃতি উপদেশ সকলের পক্ষেই প্রযোজ্য। মনু জলদান, ভূমিদান ও বস্ত্রদানকে পুণ্যকর্ম বলেছেন। সমাজের দুর্গত ও দরিদ্রদের কথা ভেবেই হয়তো তিনি এইরকম বলেছেন। শূদ্র ও নারীর ব্যাপারে মনু অনেক কঠোর ও কিছুটা মানবতাবিরোধী বিধি-বিধানের কথা বলেছেন। মনুসংহিতার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে A. B. Keith বলেছেন--  The Manusmrti, however, is not merely important as a law-book, it ranks as the expression of a philosophy of life. In Manu we have the soul of a great section of a people. 

-----


৫. যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা—  (C-9, Unit II)
ভারতীয় স্মৃতিশাস্ত্রের অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতমনুসংহিতার পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থ। যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন প্রসিদ্ধ বৈদিক ঋষি। তাঁকে আরণ্যক, যোগশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের রচয়িতারূপে স্বীকার করা হয়। শতপথ ব্রাহ্মণ ও বৃহদারণ্যক উপনিষদের সংকলয়িতাও যাজ্ঞবল্ক্য। তাঁকে মিথিলার অধিবাসী বলা হয়েছে।
যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এগুলি হল--  আচার অধ্যায়, ব্যবহার অধ্যায় ও প্রায়শ্চিত্ত অধ্যায়। তিনটি অধ্যায়ে মোট ১০১২টি শ্লোক আছে। প্রথম অধ্যায়ে ৩৬৮টি, দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৩১০টি এবং তৃতীয় অধ্যায়ে ৩৩৪টি শ্লোক আছে।

আচার অধ্যায়ের বিষয়বস্তু-- 
এই অধ্যায়ের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়--  ব্রাহ্মণাদি চার বরণের ধর্ম, ব্রহ্মচর্যাদি চার আশ্রমের ও অন্যান্য জাতির ধর্ম, গর্ভাধান, জাতকর্ম, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ প্রভৃতি সংস্কার, বেদাধ্যয়নবিধি, আচমন, গায়ত্রীজপ, সন্ধ্যা-উপাসনা, অগ্নিকার্য, অভিবাদন, ভোজনবিধি, গুরু-ঋত্বিক্‌-উপাধ্যায়ের স্বরূপ, বেদপাঠের মাহাত্ম্য, ব্রহ্মচর্যবিধি, ব্রহ্মচারীর কর্তব্য, বিবাহের জন্য কন্যা নির্বাচন, গৃহস্থের ধর্ম, বিভিন্ন প্রকার বিবাহ, কন্যাদানের অধিকারী ব্যক্তি, স্ত্রীলোকের পবিত্রতা, স্ত্রীলোকের রক্ষা, তাঁদের কর্তব্য, পঞ্চ মহাযজ্ঞ, মান্যতাবিচার, আচরণবিধি, চরিত্রের পবিত্রতা, সাধুজন-প্রশংসিত কর্ম, নিষিদ্ধকর্ম, অনধ্যায় দিবস, নিষিদ্ধভোজন, ভক্ষ্য ও অভক্ষ্য বিচার, বিভিন্ন প্রকার শুদ্ধি, দানধর্ম, শ্রাদ্ধকর্ম, পিণ্ডদান, বিভিন্ন দেবতার পূজা, রাজার গুণাবলী, তাঁর শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ, তাঁর কর্তব্য, মন্ত্রণাকার্য, রাজ্যরক্ষা, গুপ্তচরনিয়োগ, অপরাধ অনুসারে দণ্ডপ্রয়োগ, ষড়গুণ প্রভৃতি।
সকলের সাধারণ আচরণ সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-- 
‘বাক্‌পাণিপাদচাপল্যং বর্জয়েচ্চাতিভোজনম্‌’।।
সকলের ধর্ম যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন—
‘অহিংসা সত্যমস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়-নিগ্রহঃ।
দানং দয়া দমঃ ক্ষান্তিঃ সর্বেষাং ধর্মসাধনম্‌’।।
তিনি আরো বলেছেন-- ‘বিবাদং বর্জয়িত্বা তু সর্বান্‌ লোকান্‌ জয়েদ্‌ দেহী’।
ব্যবহার অধ্যায়ের বিষয়বস্তু—
যাজ্ঞবল্ক্য ব্যবহারের বিষয় সম্বন্ধে বলেছেন--
‘স্মৃত্যাচারব্যপেতেন মার্গেণাধর্ষিতঃ  পরৈঃ।
আবেদয়তি চেদ্‌ রাজ্ঞে ব্যবহারপদং হি তৎ’।।
--স্মৃতি ও আচারবিরুদ্ধ পথে অপরের দ্বারা পীড়িত হয়ে যদি কেউ রাজার কাছে আবেদন করে, তাহলে তা ব্যবহারের বিষয় হয়।
যাজ্ঞবল্ক্য কুড়ি প্রকার বিবাদপদের কথা বলেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল--  ঋণাদান, উপনিধি, দায়ভাগ, সীমাবিবাদ, স্বামিপালবিবাদ, অস্বামিবিক্রয়, দত্তাপ্রদানিক, ক্রীতানুশয়, অভ্যুপেত্যাশুশ্রূষা, সংবিদ্‌ব্যতিক্রম, বেতনাদান, দূতসমাহ্বয়, বাক্‌পারুষ্য, দণ্ডপারুষ্য, সাহস, স্তেয়, বিক্রীয়াসম্প্রদান, সম্ভূয়সমুত্থান প্রভৃতি।
উক্ত বিবাদবিষয়ের নিষ্পত্তি প্রসঙ্গে প্রাড্‌বিবাক, প্রতিভূ, সাক্ষী প্রভৃতি, ঋণাদানের ক্ষেত্রে আধি, বৃদ্ধি প্রভৃতি, দায়প্রসঙ্গে স্ত্রীধন, সংসৃষ্টী প্রভৃতি বিষয়ও এই অংশে আলোচিত হয়েছে।

প্রায়শ্চিত্ত অধ্যায়ের বিষয়বস্তু—
এই অধ্যায়ে বিভিন্ন ধরণের অশৌচ, যেমন-- মরণে অশৌচ, জন্মে অশৌচ, সপিণ্ড ব্যক্তির মরণে অশৌচ, বিভিন্ন বর্ণের অশৌচকাল, অশৌচশুদ্ধি, বিভিন্ন বর্ণের আপদ্ধর্ম, বানপ্রস্থ, যতিধর্ম, অধ্যাত্মতত্ত্ব, ব্রহ্মহত্যার প্রায়শ্চিত্ত, সুবর্ণচোরের প্রায়শ্চিত্ত, গোপনে কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি।

মূল্যায়ন--  যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতার কিছু বিষয় বর্তমান সমাজব্যবস্থার পক্ষে অপ্রয়োজনীয়। যেমন-- বানপ্রস্থ, যতিধর্ম প্রভৃতি। আবার সুস্থ সামাজিক অবস্থা বজায় রাখার জন্য গৃহস্থের আচার, সকলের  আচরণবিধি, মান্যতা প্রভৃতি বিষয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়গুলি ভারতীয় হিন্দু পারিবারিক আইন, ফৌজদারী ও দেওয়ানী বিধির অন্যতম উৎসস্বরূপ।
যাজ্ঞবল্ক্য-কথিত চতুষ্পাদ্‌ ব্যবহারের মূল বিষয়গুলি বর্তমানেও অনুসৃত হয়। ঋণাদান, সুদসহ তা আদায়, ক্রেতাসুরক্ষা, সমবায় কারবার, সীমানা নিয়ে বিবাদ প্রভৃতি বিষয়ে বিবাদের নিষ্পত্তি সংক্রান্ত যাজ্ঞবল্ক্যের বিধান অনেক যুক্তিসঙ্গত। সামগ্রিকভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষে আচরণীয় রীতি-নীতি, সমাজব্যবস্থা, সমাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতার গুরুত্ব অপরিসীম। যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে Winternitz বলেছেন--  It can not be denied that Yājñavalkya's views are more modern and more advanced than those of Manu. The arrangement of the subject-matter is more concise, clearer and more systematic.

-----

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—