ads

ad

শিবলিঙ্গ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা

শিবলিঙ্গ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা—
শিবলিঙ্গের পূজা এখন সারা দেশেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। লিঙ্গ শব্দের অর্থ প্রতীক বা চিহ্ন। শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ, যেমন বিষ্ণুর প্রতীক শালগ্রাম শিলা। শিবলিঙ্গের পূজা মানে শিবের পূজা। কিন্তু বেশীর ভাগ পণ্ডিত ব্যক্তি শিবলিঙ্গের পূজাকে প্রজনন শক্তির উপাসনা মনে করেন। তারা লিঙ্গপ্রতীককে পুংজননেন্দ্রিয় , গৌরীপটকে যোনির প্রতীক ধরে শিবলিঙ্গকে সৃষ্টি কর্মের প্রতীকরূপে গ্রহণ করেছেন।
শিবলিঙ্গের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন পুরাণে নানা ধরণের কাহিনী আছে। সেই কাহিনীগুলির বেশীর ভাগই অশ্লীল। তার মধ্য থেকে বেছে দু’একটা বলছি--
স্কন্দপুরাণের প্রভাস খণ্ডে জ্যোতির্লিঙ্গের আবির্ভাবের কাহিনী—
একদিন ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে দু’জনের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। সহস্র বৎসর চলার পর সেই যুদ্ধের মাঝে আবির্ভূত হয় এক তেজোময় মহালিঙ্গ। সেই সময়ে আকাশবাণী হয়—তোমরা যুদ্ধ থামাও। এই মহালিঙ্গকে দেখ। যিনি এর শেষ দেখতে পাবেন, তিনিই হবেন শ্রেষ্ঠ। তখন ব্রহ্মা ঊর্ধ্ব লোকে এবং বিষ্ণু অধোলোকে যাত্রা করলেন লিঙ্গের শেষ দেখার জন্য। কিন্তু কেউই শেষ দেখতে পারলেন না। বিষ্ণু রুদ্রের তেজে দগ্ধ হয়ে কাল (কৃষ্ণ) হয়ে গেলেন। ব্রহ্মা শেষ দেখেছেন বলে মিথ্যা দম্ভ প্রকাশ করেন। বিষ্ণু তাকে শ্রেষ্ঠ বলে মেনে নিলেও মিথ্যা বলার জন্য মহাদেব তাঁকে অভিশাপ দেন।
ব্রহ্মাণ্ডপুরাণেও ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর বিবাদকালে অগ্নিময় জ্যোতির্লিঙ্গের আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে।
শিবপুরাণে বলা হয়েছে –
‘মহানল স্তম্ভ বিভীষণাকৃতি-র্বভূব তন্মধ্যতলে স নিষ্কলঃ।‘
(বিশাল, অত্যন্ত ভীষণ অগ্নিস্তম্ভ তাঁদের মধ্যে অবির্ভূত হল। তার মধ্যে মহাদেব রইলেন নিরাকার অবস্থায়।)
শিবপুরাণের আর একটি কাহিনীতে বলা  হয়েছে—
ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর বিবাদ নিবৃত্ত করার জন্য এবং তাঁদের জ্ঞান লাভের জন্য উভয়ের মধ্যে সহস্র লেলিহান শিখা-শোভিত প্রলয়কালীন  অগ্নির মত ক্ষয়-বৃদ্ধি রহিত, আদি-মধ্য-অন্তহীন, নিরাকার, বিশ্বের কারণস্বরূপ লিঙ্গের আবির্ভাব হল। এই রকম অদ্ভুত বস্তু কোথা থেকে জন্মাল তা জানার জন্য ব্রহ্মা হংসরূপে এবং বিষ্ণু শ্বেত বরাহরূপে লিঙ্গের উপরে ও নীচে পরিক্রমা করে আদি অন্ত না পেয়ে এক শত বৎসর যাবৎ সেই জ্যোতির্লিঙ্গের ধ্যানে ও স্তবে নিমগ্ন রইলেন। তারপর দশভুজ পঞ্চানন মহাদেব তাঁদের দেখা দেন। এই মহাদেবের রূপ-এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে—
‘এতস্মিন্নন্তরেঽন্যচ্চ রূপমদ্ভুসুন্দরম্।
পঞ্চবক্ত্রং দশভুজং কর্পূর-গৌরকম্।।
নানাকান্তি-সমাযুক্তং নানাভরণ-সংযুতম্।
মহোদয়ং মহাবীর্যং মহাপুরুষ লক্ষণম্।।‘
মহাদেব ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের  ধ্যান সহকারে লিঙ্গপূজা উপদেশ দেন।
কূর্ম পুরাণেও আদি-অন্তহীন তেজোময় জ্যোতির্লিঙ্গের বর্ণনা আছে।
এই তেজোময় জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতীকরূপে প্রস্তরখণ্ডে পূজা উপাসনা শুরু হয় তখনই হয়তো লিঙ্গ শব্দের প্রতীক অর্থ বাদ দিয়ে লৌকিক অর্থে শিবের জননেন্দ্রিয়ে পরিণত হয়। এরপর শিবের পত্নী শিবানীর সঙ্গে শিবের একাত্মকতার কারণরূপে অর্ধনারীশ্বরের প্রতীকরূপে শিবের জননেন্দ্রিয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় শিবানীর যোনি। এই যোনিকে গৌরীপট বা গৌরীপট্ট বলা হয়।
পরবর্তীকালে মনুষ্যলিঙ্গের সাদৃশ্যে শিবের জননেন্দ্রিয় থেকে শিবলিঙ্গের উৎপত্তির বহু বিচিত্র কাহিনীর জন্ম হয়েছে । যার ফলে একটা পবিত্র বিষয়ের মধ্যে অনেক অশ্লীলতা প্রবেশ করে শিবের চরিত্রকেও অনেকাংশে কলুষিত করেছে।
শিবলিঙ্গের উৎপত্তির যে কাহিনী প্রচলিত তার দুটি রূপ—একটি হল সূর্য ও অগ্নির তেজোময় জ্যোতির্লিঙ্গের আবির্ভাব সম্পর্কিত। আর একটি হল মনুষ্যাকৃতি শিবের জননেন্দ্রিয় থেকে শিবলিঙ্গের উৎপত্তি এবং সৃষ্টির প্রতীকরূপে শিবাণীর যোনির সঙ্গে শিবলিঙ্গের সংযোগ সম্পর্কিত।
শিবলিঙ্গের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বে—
মহাদেব সৃষ্টির সময় জলের মধ্যে তপস্যায় নিমগ্ন হন। সেই সময় ব্রহ্মা আর একজন প্রজাপতি সৃষ্টি করে তাঁকে জীব সৃষ্টি করতে আদেশ দিলেন। প্রজাপতি অনেক প্রাণী সৃষ্টি করলেন। মহাদেবের ধ্যান ভাঙল। তিনি জল থেকে উঠে দেখলেন সৃষ্টিকর্ম সম্পূর্ণ হয়েছে। এরপর নিজের লিঙ্গের আর কোন প্রয়োজন নেই ভেবে তিনি তা ছিন্ন করে মুজবত পর্বতে চলে গেলেন। সেই  শিবলিঙ্গ ভূমিতে প্রোথিত হল।
মহাভারতের অনুশাসন পর্বে উপমন্যু ইন্দ্রকে বলেছিলেন – দেবতারা শঙ্কর ছাড়া অনা দেবতার লিঙ্গ পূজা করেন না। এরপর উপমন্যু শিবলিঙ্গের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন—
‘পুংলিঙ্গং সর্বমীশানং স্ত্রীলিঙ্গং বিদ্ধি চাপ্যুমাম্।
দ্বাভ্যাং তনুভ্যাং ব্যাপ্তং হি চরাচরামিদং জগৎ।।‘
(সমস্ত পুংলিঙ্গ বা পুরুষ ঈশান বা শিব এবং সকল স্ত্রীলিঙ্গ বা স্ত্রী জাতি উমা। উভয়ের দেহের দ্বারা স্থাবর-জঙ্গমাত্মক জগৎ পরিব্যাপ্ত।)
এখানে লিঙ্গ মানে প্রতীকও হতে পারে। মনে হয় এখানে বিশ্বব্যাপী শিবশক্তি এবং পুরুষ প্রকৃতির প্রকাশের মাধ্যমে সৃষ্টি রহস্যের গভীর তত্ত্বই  উদ্ঘাটিত হয়েছে।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে—
‘যো যোনিং যোনি মধিতিষ্ঠত্যেকো যস্মিন্নিদং স ন বিচৈতিসর্বম্।
তমীশানং বরদং দেবমীড্যং নিচাষ্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি।।‘ (৪/১১)
(যে রুদ্র একাকী যোনিতে যোনিতে অধিষ্ঠান করেন, যার মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিরাজমান, তিনি সকলই ব্যাপ্ত করে আছেন। সেই বরদ ঈশানকে জানলেই  অত্যন্ত শান্তি বা মুক্তি লাভ করা যা্রা)
এখানে যোনি বলতে স্ত্রীজননেন্দ্রিয় নয়, সমস্ত জগতের কারণকে বোঝানো হয়েছে। ব্রহ্মরূপী রুদ্র বা ঈশান এই জগতের কারণস্বরূপ।
যে জ্যোতির্লিঙ্গ লিঙ্গ প্রতীকের মূল, তাই সৃষ্টিতত্ত্বের মূল বিষয়।
শিবলিঙ্গের পূজা যে জননেন্দ্রিয়ের পূজা নয়, শিবের প্রতীক উপাসনা তা অনেক পণ্ডিত ও গবেষক তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন।
লিঙ্গ শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রতীক বা symbol.  শিবলিঙ্গ বলতে শিবের প্রতীক উপাসনাই বোঝায়। লিঙ্গ শব্দের জননেন্দ্রিয় অর্থ অত্যন্ত সংকীর্ণ ও গ্রাম্য। স্থূল শরীরের কারণস্বরূপ অষ্টাদশ (বা সপ্তদশ) অবয়ব বিশিষ্ট লিঙ্গশরীর বা কারণশরীর বলে শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে। স্থূল শরীর বিনষ্ট হওয়ার পর এই লিঙ্গ শরীরই অন্য দেহে প্রবেশ করে। কাজেই স্থূল দৃষ্টিতে শিবলিঙ্গ-পূজাকে ভাবা ঠিক নয়।
ভারতীয়গণ শিবলিঙ্গকে ‘বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজম্’ বলে পূজা করেন। নানা জায়গায় শিবলিঙ্গের নানা ধরণ আছে। যেমন—বেনারসে বিড়লা মন্দিরে পঞ্চমুখ বিশিষ্ট শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত আছে। নবদ্বীপে বুড়াশিব, যোগনাথ, দন্ডপাণি প্রভৃতি শিবলিঙ্গে মুখ, চোখ ও নাক আছে। হিন্দুরা বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে দেবতার উপাসনা করে থাকেন। যেমন জলপূর্ণ ঘট সকল দেবতার প্রতীক ধরা হয়। এছাড়া পাথর, গাছ ইত্যাদিকেও দেবতার প্রতীক হিসাবে ধরা হয়।
সূর্যাগ্নিরূপী রুদ্র-শিবের যে সর্বব্যাপী তেজ বা কিরণ তারই প্রতীক হচ্ছে প্রস্তর নির্মিত বা মৃত্তিকা নির্মিত শিবলিঙ্গ। এটা জ্যোতির্লিঙ্গেরই প্রতীক। পুরাণের রচয়িতারা আসল তত্ত্ব ভুলে গিয়ে শিবলিঙ্গ সম্বন্ধে নানা অশ্লীল কাহিনী তৈরি করে লোকের মনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। কারা কি উদ্দেশ্যে এই সমস্ত কাহিনী লিখেছেন তা গবেষণা-সাপেক্ষ।
সে যাই হোক না কেন ভারতীয়রা যাকে দেবাদিদেব মহাদেব মেনে যুগ যুগ ধরে নিজেদের অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছেন, যাকে একইসঙ্গে জ্ঞান ও কল্যাণের দেবতা মনে করেন   জনমানসে তাঁর আসন সুচিরস্থায়্ন--চীন, জাপান, তিব্বত, মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা, জাভা, বোর্ণিও, বলি, ব্রহ্মদেশ প্রভৃতি দেশে  শিব বিভিন্ন নামে পূজিত হয়েছেন।
যেমন—জাপানে মকেইসুরতেন (Makeishura-Ten)—মহেশ্বর, ঈশান্তেন—ঈশান, সোক্যো কন্নোন (Shokyo Kannon)—নীলকণ্ঠ, দৈকোকু (Daikoku)—মহাকাল। চীনের কুয়ান-যিন (Kuan-yin) বা নীলকণ্ঠ অবলোকিতেশ্বরের ৩৩টি মূর্তির অন্যতম।
যজুর্বেদের যুগ থেকেই আর্যদেবতা শিব অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকদেরও পূজা লাভ করেছেন। তারপর কয়েক হাজার বছর ধরে শিব নানা জাতির উপাস্য দেবতা হয়ে নানা রকম বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছেন। মহাভারতে ও পুরাণে শিব জগৎকে রক্ষা করার জন্য কালকূট বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হয়েছেন। এই বিষপান থেকেই সম্ভবতঃ শিবকে করা হয়েছে গাঁজাখোর, ভাঙখোর, ধুতুরাখোর। গাঁজা ভাঙ ধুতুরার নেশায় তাঁর চোখ ঢুলু ঢুলু। তাঁর হাতে দেওয়া হল নরকপাল, তাঁকে করা হল শ্মশানচারী, তাঁর গলায় পরানো হল হাড়ের মালা, হাতে দেওয়া হল ডমরু ও শিঙ্গা। সামান্যতম স্তবেও তিনি সন্তুষ্ট, অসুরদের স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের বর দিয়ে তিনি বিপদ ডেকে আনেন, আবার সময়ে সময়ে তাদের হত্যাও করেন। তিনি কোথাও হাতে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ভিক্ষা করছেন, আবার বাংলায় তিনি কৃষকও হচ্ছেন। এইভাবে নানা বিরুদ্ধ গুণে বিভূষিত শঙ্কর মহাদেব আর্য, অনার্য, জ্ঞানী-মূর্খ সকলেরই  ভক্তি ও শ্রদ্ধার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সত্যিই তিনি দেবাদিদেব মহাদেব।

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1