ads

ad

মনুর বিধান ও কিছু কথা


মনুর বিধান ও কিছু কথা
আজকাল  কিছু বাঙালী  বুদ্ধিজীবির মুখ থেকে ‘মনুবাদ’ কথাটি শোনা যায়। একদল  বলেন—‘মনুবাদ’ নিপাত যাক।  তাদের মতে—আমাদের সমাজে যত কুসংস্কার, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, সঙ্কীর্ণতা প্রভৃতি যত ক্ষতিকর দিক আছে তার জন্য মনুই দায়ী। এই মনুর জন্যই আমাদের সমাজের  এই দুরবস্থা। এখন মনুর সব কথাই অপ্রাসঙ্গিক।
আর একদল বলেন—মনুর বিধানই সেরা, মনু যা বলেছেন তা ভেষজ—
‘যদ্বৈ কিঞ্চ মনুরবদৎ তদ্ ভেষজম্।‘
কাজেই —মনুবাদী হও। মনু যা বলেছেন তা জীবনে অনুসরণ কর।
সমস্যাটা হল—মনুবাদ ব্যাপারটা কি তাই নিয়ে।
আমার মনে হয়-- যারা মনুবাদী বলে নিজেরা গর্ববোধ করেন এবং যারা মনুর বিরুদ্ধবাদী বলে নিজেদের প্রগতিশীল ভাবেন—তাদের কোন পক্ষই  ঠিক কথা বলছেন না। উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই কিছু দোষ আছে। মনু যা বলেছেন তার সবকিছুই যেমন খারাপ নয়, আবার সবকিছু ভালও নয়।
এখন প্রশ্ন—মনু কে? তাঁর মতবাদই বা কী যা নিয়ে এত বিতর্ক?
আসুন, মনু সম্বন্ধে আমরা সাধারণভাবে একটু জেনে নিই।
মনু একটি সুপ্রাচীন নাম। তাঁর সম্বন্ধে বিভিন্ন গ্রন্থে নানারকম তথ্য আছে। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ৯৬নং সূক্তে মনুকে মানবজাতির আদি পিতা বলা হয়েছে—
‘স পূর্বয়া নিবিদা কব্যতায়োরিমাঃ প্রজা অজনয়ন্মনুনা।‘
--অগ্নি মনুর স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে সমস্ত মানুষকে জন্ম দিয়েছিলেন।
ঋগ্বেদের ২য় মণ্ডলের ৩৩নং সূক্তে, ৮ম মণ্ডলের ৩০নং সূক্তে, ১০ম মণ্ডলের ৩৬নং সূক্তে, ঋগ্বেদের আরো বেশ কিছু স্থানে, শতপথ ব্রাহ্মণ, অথর্ববেদ, তৈত্তিরীয় সংহিতা, ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ, তান্ড্য মহাব্রাহ্মণ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা প্রভৃতি গ্রন্থে মনুর উল্লেখ আছে।
মহাভারতের শান্তিপর্বে (২১/১১) স্বায়ম্ভুব মনুর কথা আছে। বনপর্বে  (৩৫/২১) মনুর রাজধর্ম  বর্ণনার কথা আছে। দ্রোণ পর্বে (৭/১) তাঁর অর্থনীতির কথা আছে।
রামায়ণের বালকাণ্ডে (১৮/৩০-৩২) মনু কথিত দুটি শ্লোকের উল্লেখ আছে।
বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন প্রসঙ্গে মনুকে মানবজাতির  পিতা, পুরাতন ঋষি, অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা প্রভৃতিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। মনুসংহিতায় স্বায়ম্ভুব মনুকে ব্রহ্মার পৌত্র বলা হয়েছে এবং এই মনুর বংশে আরো ছয়জন মহাতেজস্বী মনু জন্মগ্রহণ করেন। এরা হলেন—স্বারোচিষ, ঔত্তমি, তামস,রৈবত, চাক্ষুষ ও বৈবস্বত। এই মনুগণ প্রত্যেকেই অধিকারবলে  বিশ্বসংসার সৃষ্টি করে প্রতিপালন করেন এবং নিজের নিজের বংশ বিস্তার করেছিলেন।
প্রত্যেক মূল জাতির আদি পিতা এক একজন মনু এবং তাঁদের নামানুসারেই সেই জাতির জীবিতকালকে মন্বন্তর বলা হয়।  বর্তমানে বৈবস্বত মনুর শাসনকাল চলছে।
এইগুলি সবই গল্পগাথা।
এবার আসল কথায় আসা যাক—যা নিয়ে বিতর্ক।
মনু-প্রবর্তিত সমাজব্যবস্থা বর্ণাশ্রম ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত। চার  বর্ণ-- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। চার আশ্রম—ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। প্রথমদিকে
গুণ ও কর্ম বশতঃ বর্ণভাগ হলেও কালক্রমে তা জন্মগতভাবেই নির্ধারিত হয়।
মনু শূদ্র ও নারীদের ব্যাপারে অনেক পক্ষপাতদুষ্ট বিধান দিয়েছেন।
যেমন--- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য –এই তিন বর্ণের  কোন রকম নিন্দা না করে    তাদের সেবা করাই শূদ্রের পরম ধর্ম-- একমেব তু শূদ্রস্য প্রভুঃ কর্ম সমাদিশৎ।
         এতেষামেব বর্ণানাং শুশ্রূষামনসূয়য়া।। (মনু--/৯১)
মনুর মতে--
শূদ্রের বিশিষ্ট কর্ম  হল ব্রাহ্মণদের সেবা করা। এছাড়া সে যাই করুক না কেন তা সবই নিষ্ফল।—
‘বিপ্রসেবৈব শূদ্রস্য বিশিষ্টং কর্ম কীর্ত্যতে।‘
যদতোঽন্যদ্ধি কুরুতে তদ্ভবত্যস্য নিষ্ফলম্।।‘  (মনু—১০/১২৩)

মনু  শূদ্রের পড়াশুনা (অধ্যয়ন), পড়ানো  (অধ্যাপনা), উপনয়ন  সংস্কার,যাগযজ্ঞাদি কর্ম, অর্জিত অর্থের সঞ্চয় নিষিদ্ধ করেছেন।
মনুর যুক্তি হল— শূদ্র অর্থ সঞ্চয় করলে তার শাস্ত্রজ্ঞান না থাকার জন্য  ধনমদে মত্ত হয়ে ব্রাহ্মণদের অবমাননা করতে পারে—
‘ শক্তেনাপি  হি  শূদ্রেণ ন কার্য্যো ধনসঞ্চয়ঃ।
শূদ্রো হি ধনমাসাদ্য ব্রাহ্মণেন বাধ্যতে।।‘  (মনু—১০/১২৯)

দেখুন একবার-- অপযুক্তি কাকে বলে!
শূদ্র পড়াশুনা করতে পারবে না।  পড়াশুনা না করলে  শাস্ত্রজ্ঞান হবে কোথা থেকে? আবার সঞ্চয়ও করতে পারবে না। তাহলে তার অবস্থার উন্নতি হবে কী করে?
মোদ্দা কথা—পড়াশুনা করলে, অর্থ উপার্জন করলে সে তো আর কারো বাড়ি কাজ করবে না। সে ধীরে ধীরে স্বাধীনচেতা হবে, তার বিরুদ্ধে যে অন্যায়, অবিচার হচ্ছে তার প্রতিবাদ করতে শিখবে, একসময় ব্রাহ্মণদের supremacy-কে challenge জানাবে। তাদের অধিপত্য খর্ব হবে।
বন্ধু, আপনাদের ‘হীরক রাজার দেশে’র সেই বিখ্যাত সংলাপের কথা মনে আছে—

‘এরা যত বেশী পড়ে, তত বেশী জানে, তত কম মানে।‘

এই আশঙ্কায় প্রভাবশালী ব্রাহ্মণরা রাজাকে বাধ্য করতেন—মানবতা-বিরোধী ঐ সমস্ত বিধান কার্যকরী করতে।

শূদ্রদের অপমান ও বঞ্চনার আরো কথা আছে। যে সমস্ত শূদ্র ব্রাহ্মণদের বাড়িতে কাজ করত তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল উচ্ছিষ্ট খাবার, ছেঁড়া কাপড়, ছেঁড়া কাঁথা-  
কম্বল ইত্যাদি । প্রমাণ—
‘উচ্ছিষ্টমন্নং দাতব্যং জীর্ণানি বসনানি চ।
পুলাকাশ্চৈব ধান্যানাং জীর্ণাশ্চৈব পরিচ্ছদাঃ।।‘  (মনু—১০/১২৫)

মনু  শূদ্রদের দাস করার কথা বলেছেন। স্বয়ম্ভূ প্রজাপতি নাকি দাসত্ব করার জন্যই শূদ্রদের সৃষ্টি করেছেন—
‘শূদ্রন্তু কার‍য়েদ্দাস্যং ক্রীতমকৃতমেব বা।
দাস্যায়ৈব হি সৃষ্টোঽসৌ ব্রাহ্মণস্য স্বয়ম্ভূবা।।‘  (মনু—৮/৪১৩)

একবার বুঝুন কী সাঙ্ঘাতিক অমানবিক! কিছু প্রভাবশালী ব্রাহ্মণ  নিজেদের সুবিধার জন্য ‘দাসপ্রথা’ চালু করতেও রাজাকে বাধ্য করেছিলেন। এখনকার ভাষায় বললে
‘Legalised  Man-trafficking’.

মনুসংহিতায় ৭ প্রকার দাসের কথা আছে—
ধ্বজাহৃত (যুদ্ধজয়ে প্রাপ্ত), ভক্তদাস (পেটেভাতে কাজের লোক), গৃহজ (দাসীর গর্ভজাত), ক্রীতদাস (মূল্য দিয়ে কেনা), দত্রিম (অন্যকে প্রদত্ত), পৈত্রিক (বংশ পরম্পরাক্রমে দাস) এবং দন্ডদাস (দন্ডিত আসামির দাসত্ব)।
শূদ্ররাই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দাসত্ব করত।

নামকরণ ও পদবীর ক্ষেত্রে শূদ্রদের হেয় করা হয়েছে—
শূদ্রদের নাম হীনতাবাচক  বা দীনতাবাচক শব্দ দিয়ে রাখতে হবে—
‘শূদ্রস্য তু জুগুপ্সিতম্’।  (মনু—২/৩১)
এবং পদবী হবে দাসত্ববাচক।–‘ শূদ্রস্য প্রৈষ্যসংযুতম্।‘  (মনু—২/৩২)

একবার ভেবে দেখুন—আপনার ছেলে-মেয়ের নাম রাখবেন, কিন্তু সেটাও ঠিক করে দেবে সমাজ।  ভাল নাম রাখার স্বাধীনতা আপনার নেই।
উপরের কথাগুলি শোনার পর আপনাদের খুব রাগ হচ্ছে তো? হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর একটু শুনলে আপনাদের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে যাবে।

এই শূদ্র আসলে কারা?
আজকের যারা SC category-তে পড়েন তারা এবং OBC categoryর একটা বড় অংশ এই শূদ্র । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এরা অন্য তিন বর্ণের চূড়ান্ত অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা বা ভাষা তাদের ছিল না। অবশেষে আমাদের সংবিধানে এদের জন্য জনপ্রতিনিধিত্ব , শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সংরক্ষণের মাধ্যমে এদের অধিকার সুরক্ষিত হয়। সংবিধানের প্রণেতারা বুঝেছিলেন—দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে  মূল স্রোতের বাইরে রাখলে দেশের উন্নতি হবে না, চাই সকলের সমান অংশগ্রহণ এবং অবদান। এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নতির জন্য স্বামী বিবেকানন্দ সংস্কৃত শিক্ষার উপর জোর দিয়েছেন। স্বামীজির উক্তি প্রাসঙ্গিক মনে করে তুলে দিলাম—
‘‘The only safety, I tell you men who belong to the lower castes, the only way to raise your condition is to study Sanskrit.
Why do you not become Sanskrit ‘‘scholars? Why do you not spend millions to bring Sanskrit education to all castes of India? That is the question. The moment you do these things, you are equal to the Brahmins.’’
তবে প্রতিবাদী ব্রাহ্মণও যে ছিলেন তারও কিছু প্রমাণ মনুসংহিতা থেকে জানা যায়। তাঁরা বেদকে বাদ দিয়ে অন্যান্য কিছু বিষয় শূদ্রদেরও শিক্ষা দিতেন। আবার কিছু শূদ্রও  ব্যাকরণ  প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদানে দক্ষ ছিলেন।  মনু-কথিত ‘শূদ্রশিষ্য’  ও ‘শূদ্রগুরু’ শব্দ দুটির  উল্লেখ থেকে তা মনে হয়। মনু এদের সুনজরে দেখেন নি।
ভৃতকাধ্যাপকো যশ্চ ভৃতকাধ্যাপিতস্তথা।
শূদ্রশিষ্যো গুরুশ্চৈব বাগ্দুষ্টঃ কুন্ডগোলকৌ ।।--মনু/১৫৬)

ব্রাহ্মণদের মধ্যে সবাই যে সৎ ছিলেন না তাও মনু বলেছেন। ব্রাহ্মণদের মধ্যে চোর, জুয়াড়ি, সুদখোর ইত্যাদিও ছিল। মনু ব্রাহ্মণদ্বেষী ব্রাহ্মণের কথাও বলেছেন।  শ্রৌত-স্মার্ত ক্রিয়াপরায়ণ ব্রাহ্মণ ছাড়াও বাঁচার জন্য অনেক ব্রাহ্মণ নানা ধরণের পেশা গ্রহণ করেছিলেন। মনু যে সমস্ত ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সদাচারী ব্রাহ্মণদের সামাজিক সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করেছেন তারা হলেন—
বেদাধ্যয়ন-শূন্য ব্রহ্মচারী, চর্মরোগগ্রস্ত, জুয়াড়ি, অনেক জায়গায় যজমানি করেন, চিকিৎসক, মাংসবিক্রেতা, সরকারি ভৃত্য, সুদখোর, যক্ষ্মারোগী, জীবিকা নির্বাহের জন্য পশুপালন করেন, ব্রাহ্মণদ্বেষী, পেশাদার গায়ক, নৃত্যশিল্পী, শূদ্রা নারীকে যিনি বিবাহ করেছেন, যিনি শূদ্রের শিষ্য, শূদ্রের গুরু, পতিত লোকের সঙ্গে বিবাহাদি সম্পর্ক স্থাপনকারী, মদ্যপায়ী, আখ প্রভৃতির রস বিক্রয়কারী, যারা তির-ধনুক  নির্মাণ করেন, যে ব্রাহ্মণ বেদনিন্দা করেন, আচারহীন, ধর্মকর্মে নিরুৎসাহী, দৈব-পিতৃ কর্ম পরিত্যাগকারী, শাস্ত্রাচার-বর্জিত,  চৌর্যাদি অপকর্মে নিযুক্ত, ব্যভিচারী, শূদ্রযাজী, নাস্তিক ইত্যাদি।
(উক্ত কথাগুলি  মনুসংহিতার ৩য় অধ্যায়ে ১৫০ –১৮২ শ্লোকে আছে।) মনু এদের নীচ ব্রাহ্মণ বলেছেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে—সেই যুগে অনেকেই প্রচলিত বিধিবিধান মেনে চলতেন না। ঐ সময়েই লোকে জীবন-জীবিকা এবং সামাজিক প্রয়োজন বশতঃ মনুর অনেক বিধানকেই অপ্রাসঙ্গিক মনে করত। মনুর কথা থেকেই তা প্রমাণিত হয়। ফলে মনু মরিয়া হয়ে সেগুলি কঠোরভাবে বলবৎ করতে বলেছেন।
মহিলাদের  ব্যাপারে মনু অনেক রক্ষণশীল। মনুর যে কথাটি সবচেয়ে বেশী আলোচিত এবং নানা প্রসঙ্গে অনেকেই উল্লেখ করে থাকেন, বিশেষ করে যারা নারী স্বাধীনতা নিয়ে খু্র বেশী সরব তারা ‘empowerment of women’ প্রসঙ্গে মেয়েরা কতটা পরাধীন তার একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে মনুর এই শ্লোকটি বলে থাকেন।
মনু বলেছেন—
‘পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্তা রক্ষতি যৌবনে।
রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রাঃ ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি।।‘    (মনু—৯/৩)
এখানে  ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি‘   অংশটি  নিয়েই  যত গোলমাল। এর মানে—স্ত্রীলোক স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য নয়।
এই বাক্যের আগে আরো যে তিনটি বাক্য আছে তার আক্ষরিক মানে—
স্ত্রীলোককে কুমারী অবস্থায় পিতা রক্ষা করেন, যৌবনে স্বামী রক্ষা করেন এবং বৃদ্ধ বয়সে পুত্র রক্ষা করেন। এখানে রক্ষা করা মানে দেখাশুনা করা, যত্ন নেওয়া।  
মনু এই শ্লোকে মেয়েদের সর্বতোভাবে রক্ষা করতে বলেছেন, তাঁদের পরাধীনতার কথা বলেন নি। ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি‘  বাক্যের অর্থ হওয়া উচিত—‘মেয়েদের স্বতন্ত্রভাবে  বা একা একা ছেড়ে দেওয়া  বা একা একা থাকতে দেওয়া ঠিক নয়।‘ সবসময় তাঁদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যাতে কোন অবস্থাতেই তাঁরা অসুবিধার সম্মুখীন না হন, তা দেখা পিতা, স্বামী এবং পুত্রের কর্তব্য।
এখানে যে মেয়েদের কথা বলা হয়েছে তাঁরা সংসারী মেয়ে। একবার ভাবুন—যদি কোন মেয়েকে তার বাবা ঠিকমতো লালন-পালন না করেন, কোন স্ত্রীকে যদি তার স্বামী ঠিকমতো ভরণ-পোষণ না করেন, কোন বৃদ্ধা মাকে যদি তার ছেলে না দেখেন, তবে তাদের অবস্থা কেমন হবে? এখানে মনুর বলার উদ্দেশ্য—
যেহেতু মেয়েরা physically তুলনামূলকভাবে ছেলেদের চেয়ে একটু দুর্বল এবং biologically একটু vulnerable, অতি সহজেই তারা কুলোকের কুনজরে পড়তে পারে, সেইজন্য  তাদের একা একা রাখা যাবে না। এটা ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজে  প্রচলিত ধারনা।
এক  শ্রেণীর পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করার জন্যই মনুর এই প্রয়াস বলে আমার মনে হয়।
যে সমস্ত মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারে তারাই ঠিকমতো সুরক্ষিত থাকে –এই কথাও মনু বলেছেন—
‘অরক্ষিতা গৃহে রুদ্ধাঃ পুরুষৈরাপ্তকারিভিঃ।
‘আত্মানমাত্মনা যাস্তু রক্ষেয়ুস্তাঃ সুরক্ষিতাঃ।।‘  (মনু—৯/১২)
--যে মহিলা নিজে খারাপ স্বভাববশতঃ আত্মরক্ষায় সচেষ্ট না হয়, আপ্ত পুরুষেরা ঘরে আবদ্ধ করে রাখলেও তাকে রক্ষা করা যায় না। আবার যারা আত্মরক্ষায় সব   সময় তৎপর, তাদের রক্ষা না করলেও তারা সুরক্ষিত থাকে।
মেয়েদের যে একটা স্বাধীন এবং powerful সত্তা আছে তা মনু  অস্বীকার করেন নি। তারা যে কোন সময় প্রলোভনে পড়ে বিপথে চলে যেতে পারে বলে তার আশঙ্কা ছিল। সেইজন্য তাদের কীভাবে গৃহবন্দী করে রাখা যায় সেই বিষয়ে তিনি সংসারের যাবতীয় কাজকর্মের দায়িত্বভার মেয়েদের উপর ন্যস্ত করার কথা বলেছেন।
অর্থস্য সংগ্রহে চৈনাং ব্যয়ে চৈব নিয়োজয়েৎ।
শৌচে ধর্মেঽন্নপক্ত্যাঞ্চপারিণাহ্যস্য  বেক্ষণে।।--ম নু—৯/১১)
অর্থাৎ পিতা বা স্বামীর অর্জিত অর্থ ঠিকমতো জমা রাখা ও খরচ করা, গৃহের উপকরণ শুদ্ধ রাখা, রান্না-বান্না, সংসারের যাবতীয় জিনিস-পত্রের দেখাশুনা করা মেয়েদের প্রধান কাজ।
মনু অনেক রক্ষণশীল। এখনকার দিনে যা স্বাভাবিক বলে অনেকের মনে হয় মনু সেগুলিকে দোষ বলেছেন। যেমন—মদ্যপান, অসৎ পুরুষের সঙ্গ, স্বামী থেকে বিচ্ছেদ, যত্র তত্র ঘুরে বেড়ানো, অসময়ে ঘুমানো, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দীর্ঘদিন থাকা ইত্যাদি। এই ছয়টি দোষের দ্বারা নারী দূষিত হয়।
পানং দুর্জনসংসর্গঃ পত্যা চ বিরহোঽটনম্।
স্বপ্নোঽন্যগেহবাসশ্চ নারীসন্দূষণানি ষট্।। (মনু--৯/১৩)
মনু স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে বলেছেন। ব্যভিচারী হলে উভয়েরই শাস্তির বিধান দিয়েছেন। ব্যভিচারে লিপ্ত নারীকে প্রকাশ্য স্থানে কুকুর দিয়ে কামড়ানোর কথা বলেছেন এবং ব্যভিচারী পুরুষকে গরম লোহার উপর শুইয়ে দিয়ে তার উপর কাঠ দিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার কথা বলেছেন। পরকীয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য এই বিধান। (মনু-৮/৩৭১,৩৭২)

সকলেই যে মনুর বিধান  মেনে চলতেন  তা কিন্তু নয়। প্রাণের আবেগ, প্রাণের টান বলে তো একটা ব্যাপার আছে। তাই কখনো প্রাণের আবেগে,  কখনো জৈবিক তাগিদে প্রচলিত বিধিবিধানের বিরুদ্ধে  কিছু কিছু নারী-পুরুষ চলে যেত। এখনো যেটা হয়, তখনো তা হত। এখনো লোকে সেইসব পুরুষ ও মহিলাকে ব্যভিচারী বলে, তখনো বলত।  ভদ্রলোকেরা এখনো তাদের নিন্দা করে, তখনো নিন্দা করত।
তবে এই ব্যাপারে মনু মহিলাদেরই বেশী দোষী বলেছেন। এই খানটাতেই প্রগতিশীলদের আপত্তি এবং তা যুক্তিসঙ্গত ।
যারা রক্ষণশীল তারা মনুকেই সমর্থন করেন। এদের সংখ্যাটাই সমাজে বেশী। ফলে এখনো একবিংশ শতাব্দীতেও  আমাদের সমাজে honour killing চলে। মেয়েদের চরিত্রে প্রায় সকলেই সন্দেহ প্রকাশ করে। ভবভূতি এদের দুর্জন বলেছেন—
‘যথা বাচাং তথা স্ত্রীণাং সাধুত্বে দুর্জনো জনঃ।‘
মনু মেয়েদের সমস্ত সংস্কার মন্ত্রহীন করতে বলেছেন, অর্থাৎ শূদ্রদের মতোই।
মনু রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে মহিলাদের দেখলেও তাদের সম্মান জানানোর কথাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন।---
‘পিতৃভির্ভ্রাতৃভিশ্চৈতাঃ পতিভির্দেবরৈস্তথা।
পূজ্যা ভূষয়িতব্যাশ্চ   বহুকল্যাণমীপ্সুভিঃ।।‘
‘যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ।
যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে  সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।।‘ (মনু—৩/৫৫-৫৬)
(সংসারের কল্যাণের জন্য বাবা, ভাই, স্বামী ও দেওয়র সম্মান সহকারে  মেয়েদের ঠিকমতো  ভরণপোষণ ও অলংকারাদি দ্বারা অলংকৃত করবে।
যে বংশে মেয়েদের সম্মান করা হয় দেবতারা সেই বংশের প্রতি প্রসন্ন হন, আর যে পরিবারে মেয়েদের সম্মান করা হয় না, সেখানে কোন ধর্মকর্মই সুফল প্রদান করে না।)
মনু আরো বলেছেন—যে পরিবারে মেয়েরা সবসময় দুঃখে থাকে, সেই পরিবার অচিরেই ধ্বংস হয়, যেখানে তাদের কোন দুঃখ থাকে না, সেই পরিবারের দ্রুত উন্নতি হয়।–
‘শোচন্তি  জাময়ো যত্র বিনশ্যত্যাশু তৎকুলম্।
ন শোচন্তি তু যত্রৈতা বর্ধতে তদ্ধি সর্বদা ।।‘ (মনু—৩/৫৭)
মনু মেয়েদের ব্যাপারে conservative হলেও  ক্ষেত্রবিশেষে তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে সমর্থন করেছেন।। যেমন—  তিনি বলেছেন--
বিয়ের নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে  গেলে মেয়েরা নিজেদের পছন্দমতো স্বামী নির্বাচন করতে পারবেন।
মনুসংহিতায় আবার মেয়েদের সম্পর্কে অপমান-সূচক কথাও আছে। যেমন—
নারীরা পুরুষের রূপ, গুণ, বয়স বিচার না করে কেবলমাত্র জৈবিক তাগিদেই  পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা বসে থাকে, কাজ করে না,সবসময় সাজগোজ করে, তারা নীচ, কাম-ক্রোধের বশীভূত, নীচাশয়, দুশ্চরিত্র, অস্থিরমতি, স্নেহহীন ইত্যাদি। (মনু—৯ম অধ্যায়)। এই কথাগুলি সমস্ত নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
যে মনু নারীদের সম্বন্ধে অত ভাল কথা বলেছেন তারপর এই কথাগুলি ঠিক মানানসই বলে মনে  হয় না। প্রগতিবাদীরা মনুর এই খারাপ কথাগুলিকেই হাতিয়ার করে তার বিরুদ্ধে তীব্র বিষ উগড়ে দিয়েছেন।
মনু অনুলোম বিবাহকে সমর্থন করেছেন, কিন্তু প্রতিলোম বিবাহকে সমর্থন করেন নি।  উচ্চ বর্ণের লোকের দ্বারা নিম্ন বর্ণের মেয়েকে বিয়ে করা হল অনুলোম বিবাহ এবং নিম্ন বর্ণের লোকের দ্বারা উচ্চ বর্ণের মেয়েকে বিয়ে করা হল প্রতিলোম বিবাহ।
সমাজে সবর্ণ বিবাহই প্রশংসিত ছিল। প্রতিলোম বিবাহ নিন্দিত ছিল।
অসবর্ণ বিবাহে যে সন্তানের জন্ম হত তাদের বিভিন্ন নাম ছিল। এদের থেকে উৎপন্ন জাতিকে সঙ্কর জাতি বলা হয়েছে। যেমন—
১. ব্রাহ্মণ পুরুষ ও বৈশ্য নারীর সন্তান—অম্বষ্ঠ।
২. ব্রাহ্মণ পুরুষ ও শূদ্র নারীর সন্তান—নিষাদ বা পারশব।
৩. ক্ষত্রিয় পুরুষ ও শূদ্র নারীর সন্তান—উগ্র।
৪. ক্ষত্রিয় পুরুষ ও ব্রাহ্মণ নারীর সন্তান—সূত
৫. বৈশ্য পুরুষ ও ক্ষত্রিয় নারীর সন্তান—মাগধ।
৬. বৈশ্য পুরুষ ও ব্রাহ্মণ নারীর সন্তান—বৈদেহ।
৭. শূদ্র পুরুষ ও বৈশ্য নারীর সন্তান—আয়োগব।
৮. শূদ্র পুরুষ ও ক্ষত্রিয় নারীর সন্তান—ক্ষত্তা।
৯. শূদ্র পুরুষ ও ব্রাহ্মণ নারীর সন্তান—চন্ডাল।
এইরকম আরো সঙ্কর জাতির উল্লেখ মনুসংহিতার ১০ম অধ্যায়ে দেখা যায়।
চন্ডাল পুরুষ ও নিষাদ স্ত্রী থেকে উৎপন্ন জাতি হল অন্ত্যাবসায়ী বা ডোম। শ্মশানের কাজ ছিল এদের উপজীবিকা।
মনুর সঙ্কর জাতির উল্লেখ থেকে মনে হয় বর্ণব্যবস্থার কড়াকড়ি থাকলেও প্রাণের টান ও আবেগের কাছে সমস্ত কঠোরতা হার মেনেছে। সমাজ অসবর্ণ বিবাহকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। শুধু তাই নয়, শাস্ত্রকারদের অনেক অমানবিক বিধান লোকে মেনেও চলত না। জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকেই নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশা গ্রহণ করত। মনুসংহিতার ১০ম অধ্যায়ে চার বর্ণের আপৎকালীন বৃত্তি গ্রহণের কথা সবিস্তারে বলা হয়েছে।

মনু গার্হস্থধর্মকে সবচেয়ে বড় বলেছেন এবং গৃহস্থের পক্ষে পালনীয় স্বাস্থ্যসম্মত কিছু বিধান দিয়েছেন। যেমন—গায়ে তেল মেখে স্নান করবে, যাদের টাকাপয়সা আছে তারা ছেঁড়া বা নোংরা জামাকাপড় পড়বে না, মেয়েরা চোখে কাজল পরবে, যত্র তত্র মলমূত্র ত্যাগ করবে না, অনুমতি না নিয়ে অন্যের জিনিস ব্যবহার করা যাবে না, এমন কি কারো জলাশয়ে স্নানও করা যাবে না। বেশী খাওয়া, সকাল ও সন্ধ্যায় খাওয়া ঠিক নয়। কোলের উপর কোন কিছু রেখে খাওয়া উচিত নয়। পাশাখেলা, বিছানায় বসে খাওয়া, উচ্ছিষ্টমুখে কোথাও যাওয়া উচিত নয়।

মনু শূদ্র ও নারীদের বাদ দিয়ে অন্যদের শিক্ষার কথা বলেছেন। সেই শিক্ষার বিস্তার ও গভীরতা ছিল অনেক বেশী। মূলতঃ বেদ, ব্রাহ্মণগ্রন্থ, আরণ্যক,  উপনিষদ, বেদাঙ্গ, বিভিন্ন দর্শনশাস্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র অধ্যয়নের উপরই জোর দেওয়া হত। এছাড়া বৈশ্যের জন্য কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্য, ক্ষত্রিয়ের জন্য  অস্ত্রবিদ্যাশিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল।  যে কোন বিদ্যা বা শাস্ত্রই কঠোর নিয়ম পালন করে অধ্যয়ন করতে হত।
ছাত্র ও শিক্ষকের আচরণ কেমন হবে সে সম্বন্ধেও  মনু কিছু নীতির কথা বলেছেন।
যেমন—
বিদ্যা বা বয়সে যিনি বড় তাকে কখনো নাম ধরে ডাকবে না। তিনি শয্যা বা আসনে বসে থাকলে সেখানে বসবে না, অপরিচিত গুরুজন কাছে এলে শয্যা বা আসন থেকে উঠে তাকে প্রণাম করবে এবং নিজের পরিচয় দেবে।
আবার যাকে প্রণাম করা হল তিনিও প্রণামকারীকে আশীর্বাদ করবেন।

কোথাও দেখাসাক্ষাৎ হলে চার বর্ণের  লোকেরা পরস্পর কুশল বিনিময় করবে। ব্রাহ্মণকে ‘কুশল’ শব্দের দ্বারা, ক্ষত্রিয়কে ‘অনাময়’ শব্দের দ্বারা, বৈশ্যকে ‘ক্ষেম’
শব্দের দ্বারা এবং শূদ্রকে ‘আরোগ্য’ শব্দের দ্বারা কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করতে হবে।
মামা-মামী, কাকা-কাকী, মাসি-মেসো, পিসি-পিসেমশাই, শ্বশুর-শাশুড়ী, জেঠা-জেঠী, গুরুপত্নী –এরা সকলেই গুরুজন, এদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে হবে। বড় ভাইয়ের সবর্ণা স্ত্রীকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে হবে এবং মায়ের মত মান্য করতে হবে। সকল গুরুজনের মধ্যে মা শ্রেষ্ঠ।
রক্তের সম্পর্ক নেই এমন মহিলাদের সম্মান জানিয়ে ‘আপনি’ (ভবতি), বোন (ভগিনি) বলে সম্বোধন করতে হবে।
লোককে মান্য করার মানদণ্ড হল পাঁচটি—বিত্ত, বন্ধু (আত্মীয়স্বজন), বয়স, কর্ম ও বিদ্যা। ৯০ বছরের বেশী বয়স্ক যে কোন বর্ণের লোককে সম্মান জানাতে হবে।

মনু শিক্ষাবিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন।
কাকে কাকে পাঠদান করা যাবে সে সম্বন্ধে মনু বলেছেন—
আচার্যপুত্র, সেবা করতে ইচ্ছুক, অন্য জ্ঞান দানে সমর্থ, ধার্মিক, পবিত্র, আত্মীয়, পাঠ গ্রহণ ও ধারণে সমর্থ, অর্থদানে সমর্থ, সৎ ও জ্ঞাতি –এই দশজনকে পাঠদান করা যেতে পারে। (মনু—২/১০৯)
যেখানে বিদ্যাদানের উপযোগী ধর্ম ও অর্থ লাভ হয় না, বা সেইরকম সেবাও পাওয়া যায় না সেখানে কখনো বিদ্যা দান করা যাবে না। অনুর্বর জমিতে ভাল বীজ বুনলেও যেমন নিষ্ফল হয়, তেমনি অনুপযুক্ত পা পাত্রে বিদ্যাদান করলেও তা নিষ্ফল হয়--
ধর্মার্থৌ যত্র ন স্যাতাং শুশ্রূষা বাপি তদ্বিধা।
তত্র বিদ্যা ন বক্তব্যা শুভং বীজমিবোষরে।। (মনু—২/১১২)

মনু বিদ্বান্ ব্যক্তিকেই মহান্ বলেছেন—
‘ন হায়নৈর্ন পলিতৈর্ন বিত্তৈর্ন চ বন্ধুভিঃ।
ঋষয়শ্চক্রিরে ধর্মং যোঽনুচানঃ স নো মহান্।।‘ (মনু—২/১৫৪)
--বয়স, পাকা চুল, ধনসম্পদ, আত্মীয়স্বজন-এর দ্বারা কেউ মহান্ হয় না। যিনি ছয় বেদাঙ্গ সহ বেদবিদ্যায় অভিজ্ঞ, তিনিই মহান্।
এখন অবশ্য জমানা বদলে গেছে। যার অর্থ ও ক্ষমতা আছে সেই মহান্।

ছাত্রদের কেমনভাবে শিক্ষাদান করতে হবে সে সম্বন্ধে মনু বলেছেন—
‘অহিংসয়ৈব ভূতানাং শ্রেয়োঽনুশাসনম্।
বাক্ চৈব মধুরা শ্লক্ষ্ণা প্রযোজ্যা ধর্মমমিচ্ছতা।।‘ (মনু—২/১৫৯)   
--ছাত্রদের বুদ্ধির স্তরভেদ আছে। সেইজন্য একইরকম পদ্ধতিতে সকলকে শিক্ষাদান করা বেশ কঠিন, কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষককে একটু কড়া হতেই হয়, কিন্তু মনু বলেছেন—না, তা করা যাবে না। ছাত্রদের শারীরিক বা মানসিক  কোন রকম কষ্ট দেওয়া যাবে না। শিক্ষক হিতকর বাক্যে ছাত্রদের শিক্ষাদান করবেন। মধুর ও প্রিয় কথায় ছাত্রদের বোঝাতে হবে।
এইভাবে পড়ানোর মধ্যে যে সহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও স্নেহ প্রয়োজন তা শিক্ষকের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। উক্ত গুণগুলি থাকলে তবেই কোন শিক্ষক কঠিন বিষয়গুলিকেও সহজ করে ছাত্রদের বোঝাতে পারেন। তার সেই গুণগুলি  ছাত্রদের মধ্যেও ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয় এবং পরবর্তী জীবনে তাদের ভাল মানুষ হতে সাহায্য করে।
মনুর এই কথা থেকে আর একটি শিক্ষাও আমরা লাভ করতে পারি তা হল—
শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রদের মনস্তত্ত্ব জানাও প্রয়োজন। তা না হলে পাঠদান ও পাঠগ্রহণের মধ্যে একটা gap থেকে যাবে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে।
শিক্ষকতার এই basic ব্যাপারগুলি আমরা মাথায় রাখি না বলেই আমাদের শিক্ষাদান অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকমতো হয় না।

সকলের পালনীয় সাধারণ আচরণবিধি সম্বন্ধে  মনু বলেছেন—
‘নারন্তুদঃ স্যাদার্তোঽপি ন পরদ্রোহকর্মধীঃ।
যয়াস্যোদ্বিজতে বাচা নালোক্যাং তামুদীরয়েৎ।।‘  (মনু—২/১৬১)
--নিজে কষ্ট পেলেও অন্যের মনে আঘাত করবে না, কখনো অপরের অনিষ্ট চিন্তা করবে না। যে কথার দ্বারা অন্যেরা উদ্বিগ্ন হয় সেইরকম কথা বলবে না।
অপমানকারী ব্যক্তিরই ক্ষতি হয়, যিনি অপমানিত হন তার কোন ক্ষতি হয় না।
--সুখং চরতি লোকেঽস্মিন্নবমন্তা বিনশ্যতি।‘

গুরুগৃহে ছাত্রদের অনেক কঠোর নিয়ম ব্রত পালন করতে হত।
ছাত্ররা মধু , মাংস, দই খাবে না, জুতো, ছাতা ব্যবহার করবে না, পাশাখেলা, ঝগড়া-ঝাটি, মিথ্যাভাষণ করবে না। আচার্যের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত দ্রব্যাদি সংগ্রহ করবে, ভিক্ষা করবে, সবসময় গুরুর আদেশ মেনে চলবে, গুরুকে সেবা শুশ্রূষা করবে, গুরুর প্রিয়কার্য করবে।

মনুর কথার মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে একটু অসঙ্গতি থাকলেও মূল বিষয়গুলির প্রাসঙ্গিকতা এখনও আছে। এখনকার যুগের পক্ষে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি বাদ
দিলে মনু–কথিত অন্য অনেক বিষয়  এখনো সমাজের পক্ষে অনেক উপযোগী।
আমাদের কাজ হবে—‘হংসো যথা ক্ষীরাম্বুমধ্যাৎ।‘
রাজহাঁস যেমন জলমিশ্রিত দুধ থেকে কেবল দুধটুকুই পান করে, সেইরকম আমাদেরও মনুর ভাল কথাগুলিকেই গ্রহণ করতে হবে, খারাপটাকে বাদ দিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে মনুর কয়েকটি সুন্দর কথা তুলে দিচ্ছি—
১. ‘সত্য কথা বলবে, প্রিয় কথা বলবে, কিন্তু অপ্রিয় সত্য কথা বলবে না। আবার প্রিয় অথচ মিথ্যা বলবে না।‘ (মনু--৪/১৩৮)
২. ভদ্র ব্যবহার করবে,  অভদ্র স্থলেও ভদ্র ব্যবহার করবে, কারো সঙ্গে অকারণ বিবাদ করবে না-- ‘ভদ্রং ভদ্রমিতি ব্রূয়াদ্ভদ্রমিত্যেব বা বদেৎ।
      শুষ্কবৈরং বিবাদঞ্চ ন কুর্যাৎ কেনচিৎ সহ।।‘ (মনু--৪/১৩৯)

৩. অঙ্গহীন, বেশী অঙ্গবিশিষ্ট, বিদ্যাহীন, বেশী বয়স্ক, রূপহীন, ধনহীন, অথবা নীচ জাতির লোককে তাদের নিজ নিজ হীনতার জন্য নিন্দা করবে না--
হীনাঙ্গানতিরিক্তাঙ্গান্ বিদ্যাহীনান্ বয়োঽধিকান্।
রূপদ্রব্যবিহীনাংশ্চ জাতিহীনাংশ্চ নাক্ষিপেৎ।।‘‘--(মনু--৪/১৪১)

৪. পরাধীনতাই দুঃখ, স্বাধীনতাই সুখ –সংক্ষেপে  এটাই সুখ-দুঃখের লক্ষণ বলে জানবে।    
‘সর্বং পরবশং দুঃখং সর্বমাত্মবশং সুখম্।
এতদ্বিদ্যাৎ সমাসেন লক্ষণং সুখ দুঃখয়োঃ।।‘ (মনু--৪/১৬০)

৫.  হাত ও পায়ের চঞ্চলতা ও বাচলতা ত্যাগ করবে। সবসময় সরল ব্যবহার করবে এবং পরের অনিষ্ট সাধনে বুদ্ধিকে নিযুক্ত করবে না। (মনু--৪/১৭৭)

৬. দেহ, মন প্রভৃতি সকল প্রকার শুচিতার মধ্যে অর্থশৌচ (সৎপথে অর্থ উপার্জন) শ্রেষ্ঠ। যিনি অর্থ অর্থ উপার্জনে শুচি, তিনিই প্রকৃত শুচি (পবিত্র)। (মনু—৫/১০৬)

এছাড়া মনুর আরো অনেক কথা আছে যেগুলি চিরন্তন সত্য।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মনুসংহিতার গুরুত্ব সম্পর্কে ডঃ জি. এস. অ্যারান্ড বলেছেন—
‘I am very clear after forty years’ experience of educational work in India that we shall never have National Education in this country until we have an education system which brings out the fundamental Principles of living as set forth by Manu.’

------------

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1