ads

ad

3rd sem, C-5, লৌকিক-সংস্কৃতসাহিত্যেতিহাসঃ (Broad Questions, 3-4)



৩. কস্তাবদ্‌ ইতিহাসঃ? সংস্কৃতসাহিত্যস্য ঐতিহাসিক-কাব্যানাং সবিশদমালোচ্যতাম্‌।

উত্তরম্‌--  সাধারণভাবে আমরা ইতিহাস বলতে যা বুঝি প্রাচীনভারতবর্ষে সেইরকম ইতিহাস ছিল না। বর্তমানযুগে ইতিহাসকে History-  সমার্থকরূপে ধরা হয় The Columbia Encyclopedia-তে বলা হয়েছে History in its broadest sense, is the story of man's past. More specially it means the record of that past not only in chronicles and treaties on the past, but in all sorts of forms.’
প্রাচীনভারতে ইতিহাস শব্দটি অনেক ব্যাপক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে ঋগ্বেদোপদ্ঘাতে বলা হয়েছে
দেবাসুরাঃ সংযত্তা আসন্নিত্যাদয়ঃ ইতিহাসঃ
নিরুক্তে বলা হয়েছেনিদানভূত ইতি এবমাসীদ্ইতি উচ্যতে ইতিহাসঃ
কৌটিল্য বলেছেনপুরাণমিতিবৃত্তমাখ্যায়িকোদাহরণং ধর্মশাস্ত্রমর্থমাস্ত্রঞ্চেতি ইতিহাসঃ
অমরকোষে বলা হয়েছেইতিহাসঃ পুরাবৃত্তম্
প্রাচীন আলোচনাগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়সংস্কৃত ইতিহাস শব্দটি আধুনিক ইতিহাস বা History সমার্থক নয়ইতিহাসশব্দটির ব্যুৎপত্তি—‘ইতি আস, অর্থাৎ এইরকমই ছিল অতএব শুধুমাত্র যথাযথ বাস্তব ঘটনাই নয়, প্রাচীন কাহিনী, আখ্যান, লোককথা, কিংবদন্তী প্রভৃতি পরম্পরাক্রমে যে অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেই সবগুলিই ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে

উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত ঐতিহাসিক কাব্যের বিবরণ
হর্ষচরিতঐতিহাসিক কাব্যজগতে বাণভট্টের হর্ষচরিতের বিশেষ অবদান আছে কবির পৃষ্ঠপোষক রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনের সঙ্গে জড়িত কাহিনীগুলিকে উপজীব্য করে হর্ষচরিত রচিত এতে হর্ষবর্ধনের রাজত্বের পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় না কবিজীবনের বাল্যকালের সঙ্গে হর্ষের পিতা প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যু, অগ্রজ রাজ্যবর্ধনের নিধন, ভগ্নী রাজ্যশ্রীর স্বামী গ্রহবর্মার হত্যাকারী মালবরাজ গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযান, রাজ্যশ্রীর উদ্ধার প্রভৃতি ঐতিহাসিক তথ্যের বিবরণ এখানে আছে
হর্ষচরিত ইতিহাস-নিষ্ঠ রচনা নয় মূলতঃ রোগশয্যায় শায়িত প্রভাকরবর্ধন, সেনাদলের অভিযান, স্কন্দগুপ্তের উপদেশ, হর্ষের অভিযান, বিন্ধ্য অঞ্চলের গ্রামজীবনের বর্ণানই প্রধান। এই বর্ণনা থেকে তৎকালীন নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, যুদ্ধবিগ্রহ, রাজনৈতিক অবস্থার আনুমানিক চিত্র পাওয়া যায়।

রাজতরঙ্গিণী—কল্হণ-প্রণীত রাজতরঙ্গিণী সংস্কৃত সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। কবি কাশ্মীররাজ জয়সিংহ ও অলকদত্তের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। উক্ত অলকদত্তের প্রেরণাতেই তিনি ১১৪৮-১১৫০  খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এই কাব্য রচনা করেন।
রাজতরঙ্গিণীতে ৮টি তরঙ্গ আছে। এই গ্রন্থের সমগ্র ঘটনাকে প্রধানতঃ দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—১. পুরাবৃত্ত ও কিংবদন্তী-নির্ভর প্রাচীন যুগ এবং ২. প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে পরিবেশিত পরবর্তী যুগ।
তিনটি তরঙ্গে প্রথম পর্বের বর্ণনায় কল্‌হণ বিক্রমপূর্ব দ্বাদশ শতকের রাজা গোনন্দ এবং ৫১ জন রাজার সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দুর্লভ হওয়ায় লেখক পৌরাণিক বৃত্তান্ত ও জনশ্রুতির উপর নির্ভর করেছেন। আবার অনন্ত, অবন্তীবর্মা, হর্ষ প্রমুখ রাজাদের বর্ণনায় তাঁর ইতিহাসনিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ। ৮১৩-১১৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কাশ্মীরের রাজবংশাবলীর পরিচয়, বিভিন্ন রাজার মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ, কীর্তিকলাপ এবং অন্যান্য বহু বিচিত্র তথ্য কল্‌হণ সহজ সরল ভাষায় বিবৃত করেছেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সমকালীন ইতিহাস বর্ণনায় কল্‌হণ অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
রাজনৈতিক চক্রান্ত, স্বার্থপর ক্ষ্মতালোভীদের ষড়যন্ত্র, রাজপরিবারের বিলাস-ব্যসন, সামন্ত ও ধনতন্ত্রের স্খলন-পতন, সমাজের উচ্চস্তরের মানুষের ব্যভিচার, জনজীবনের কুসংস্কার, ভয়ভীতি প্রভৃতি উপস্থাপনায় রাজতরঙ্গিণী ইতিহাসমাত্র নয়, কাব্যও বটে।

নবসাহসাঙ্কচরিত—পদ্মগুপ্ত বা পরিমল একাদশ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে এই কাব্য রচনা করেন। ধারারাজ্যের রাজা মুঞ্জের জীবনী অবলম্বনে ১৮ সর্গে গ্রন্থটি রচিত। এটি মূলতঃ ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত কাব্য, যথার্থ ঐতিহাসিক কাব্য নয়।  

বিক্রমাঙ্কদেবচরিত—একাদশ খ্রিষ্টাব্দের কাশ্মীরী কবি বিল্‌হণ ১৮ সর্গে চালুক্যবংশীয় রাজাদের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। বিক্রমাঙ্কের পূর্বপুরুষ চালুক্য থেকে এই বংশের ধারাবিবরণী শুরু। বিক্রমের পূর্বপুরুষদের কাহিনীর সঙ্গে তাঁর দাক্ষিণাত্য অভিযান, চোলরাজকুমারী চন্দ্রলেখার সঙ্গে বিবাহ, জয়সিংহকে দমন ইত্যাদি ঘটনা এখানে বর্ণিত। 

পৃথ্বীরাজবিজয়-- কাশ্মীরী কবি জয়ানক ১২টি সর্গে মধ্যযুগের শেষ হিন্দুরাজা পৃথ্বীরাজের পূর্বপুরুষদের কাহিনী এবং তাঁর বিবাহ পর্যন্ত এই কাব্যে বর্ণনা করেছেন।

রামচরিত—বাংলার কবি সন্ধ্যাকর নন্দী ২২০ টি শ্লোকে এই কাব্য রচনা করেন। এখানে রামায়ণের রাজা রামচন্দ্র এবং পালবংশের রাজা রামপাল ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের কীর্তিকলাপ বর্ণিত হয়েছে।

গউড়বহো—বাক্‌পতিরাজ প্রাকৃত ভাষায় এই কাব্য রচনা করেন। এখানে কনৌজরাজ যশোবর্মা কর্তৃক জনৈক গৌড়রাজার পরাজয় এবং নিধনের ঘটনা ১০০৮টি শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে।

শূর্জনচরিত—গৌড়ীয় কবি চন্দ্রশেখর আকবরের অনুগত  শূর্জন নামক জনৈক রাজার কাহিনী অবলম্বনে ২০টি সর্গে এই কাব্যটি রচনা করেন।

হম্মীরকাব্য—নয়চন্দ্র সূরি ১৪টি সর্গে চৌহানবংশীয় রাজাদের এবং মধ্যযুগের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ব্যক্তি রণস্তম্ভপুরের রাজা হম্মীরের জীবনী অবলম্বনে এই কাব্য রচনা করেন।

উপসংহার—ইতিহাসের যথাযথ বিচারে বৈশিষ্ট্য বিচারে সংস্কৃত ঐতিহাসিক কাব্যগুলি হয়তো যথার্থ ইতিহাস নয়, কবিগণের  উদ্দেশ্যও তা ছিল না। প্রাচীন আলোচকগণ মুনি-ঋষি, রাজা প্রভৃতি অন্যান্য সকলের জীবনীকে ইতিহাস বলেছেন। ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষের উপদেশযুক্ত ঘটনবলীই ইতিহাস। এর মধ্যে ধর্মনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির ইঙ্গিতও আছে। সংস্কৃত ঐতিহাসিক কাব্যগুলি তৎকালীন ইতিহাসকে কাব্যের মাধ্যমে পরিবেশন করেছে। তাই এগুলি একাধারে ইতিহাস ও কাব্য দুইই। ভারতীয় ঐতিহাসিক কাব্যের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে পণ্ডিত  Winternitz বলেছেন—The Indian historical writing was always just a branch of poetry. Chronicles, in which myths and history appear strongly amalgamated or biographical and historical epics and novels or also poems written in praise of kings are mixed up with historical or semi-historical topics. 

----

৪. কিং তাবৎ কথাকাব্যম্‌?  তস্য কতি ভেদাঃ? সংস্কৃত কথাকাব্যবিষয়ে সবিশদমালোচ্যতাম্‌।

উত্তরম্‌-- সংস্কৃতে গল্পকে বলা হয় কথা। এর দুটি ভাগ—এক শ্রেণীর গল্প মানুষ, দৈত্যদানব প্রভৃতি সম্পর্কিত এবং অন্য শ্রেণীর গল্পগুলি পশুপক্ষী সম্পর্কিত। মানুষ, দৈত্যদানব প্রভৃতি সম্পর্কিত কল্পনাময় কাহিনীগুলিকে ইরেজিতে বলা হয় Tales.  সমাজের  বিভিন্ন স্তরের মানুষের ব্যবহার, কার্যকলাপ  প্রভৃতি বিভিন্ন পশুপক্ষীর উপর আরোপ করে রচিত গল্পগুলিকে ইরেজিতে বলা হয় Fables. ব্যাবহারিক জীবনের উপযোগী নীতি-উপদেশ দানই এর লক্ষ্য Fables সম্বন্ধে Keith বলেছেন--The fable, indeed, is essentially connected with the two branches of science known by Indians as the Nītiśāastra and the Arthaśāstra, which have this in common as opposed to the Dharmaśātra that they are not codes of morals, but deals with man's action in practical politics and conduct of the ordinary affairs of everyday life and intercourse.
সংস্কৃত সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য Tales সোমদেবের কথাসরিসাগর, শিবদাসের বেতালপঞ্চবিংশতি, চিন্তামণি ভট্টের শুকসপ্ততি, বিদ্যাপতির পুরুষপরীক্ষা,  কালিদাসের নামে প্রচলিত সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা প্রভৃতি।  

সংস্কৃত সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য Fables— বিষ্ণুশর্মার পঞ্চতন্ত্র, নারায়ণশর্মার হিতোপদেশ, গুণাঢ্যের বৃহৎকথা, ক্ষেমেন্দ্রের বৃহৎকথামঞ্জরী, বুদ্ধস্বামীর শ্লোকসংগ্রহ প্রভৃতি।  

পঞ্চতন্ত্র—এটি fables শ্রেণীর রচনা। এর মূল চরিত্র বিভিন্ন পশুপাখি। এরা মানুষের ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীর প্রায় ৫০টি ভাষায় ২০০-এর বেশী সংস্করণে পঞ্চতন্ত্র প্রকাশিত হয়েছে। ‘তন্ত্র’ মানে গল্পসংগ্রহ। এতে পাঁচটি তন্ত্র বা পরিচ্ছেদ আছে বলে এর নাম পঞ্চতন্ত্র। এই তন্ত্রগুলি হল—মিত্রভেদ, মিত্রপ্রাপ্তি, কাকোলূকীয়, লব্ধপ্রণাশ ও অপরীক্ষিতকারক।
লেখক কথামুখে জানিয়েছেন—দাক্ষিণাত্যের মহিলারোপ্য নগরের রাজা অমরশক্তির মূর্খপুত্রদের
নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী করে তোলার জন্য সভাপণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা এই গ্রন্থ রচনা করেন। মূল রচনা গদ্যে নিবদ্ধ, মাঝে মাঝে নীতি-উপদেশমূলক শ্লোকও আছে।

হিতোপদেশ—বাংলার রাজা ধবলচন্দ্রের সভাকবি নারায়ণ এর রচয়িতা। লেখক পঞ্চতন্ত্রের রচনারীতির আদর্শ অনুসরণ করেছেন। গ্রন্থটি চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এগুলি হল—মিত্রলাভ, সুহৃদ্ভেদ, বিগ্রহ ও সন্ধি।
নারায়ণ কামন্দকীয় নীতিসারের দ্বারা অনেক প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর গল্পগুলির সঙ্গে
Arabian nights গল্পের বেশ মিল আছে। এই গল্পগুলির উপর মহাভারত, জাতক ও কথাসরিৎসাগরের গল্পের প্রভাবও দেখা যায়।

বৃহৎকথা—কিংবদন্তী অনুসারে গুণাঢ্য পৈশাচী প্রাকৃত ভাষায় সাত লক্ষ শ্লোকে এই গ্রন্থ রচনা করেন। সোমদেবের কথাসরিৎসাগরের ভূমিকায় বলা হয়েছে—শিব পার্বতীকে গল্প শোনানোর সময় শিবের অনুচর পুষ্পদন্ত সেগুলি শুনে ফেলে এবং তার কাছ থেকে গল্পগুলি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ক্রুদ্ধ পার্বতী তাকে ও তার ভাই মলয়বানকে অভিশাপ দেন। মলয়বান প্রতিষ্ঠানপুরে গুণাঢ্য নামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজা সাতবাহনকে সংস্কৃত শেখানোর ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পণ্ডিত শর্ববর্মার কাছে পরাজিত হয়ে বনবাসী হন। তিনি সংস্কৃত উচ্চারণ করবেন না –এই প্রতিজ্ঞা করে মৌনব্রত অবলম্বন করেন। ঘটনাক্রমে তিনি পিশাচ কণভূতির কাছ থেকে উক্ত গল্পগুলি শুনে নিজের রক্তে সাত লক্ষ শ্লোকে সেগুলি লিপিবদ্ধ করে রাজা সাতবাহনের কাছে পাঠান। সাতবাহন সেগুলি ফেরত পাঠালে গুণাঢ্য মনের দুঃখে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলতে থাকেন। রাজা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছুটে এসে এক লক্ষ্য শ্লোক রক্ষা করেন। এই শ্লোকসংগ্রহই বৃহৎকথা নেমে পরিচিত।
সংস্কৃতের অনেক কবি-নাট্যকার বৃহৎকথা থেকে তাঁদের রচনার উপাদান সংগ্রহ করেছেন। দণ্ডীর দশকুমারচরিত, বাণের কাদম্বরী, ধনপালের তিলকমঞ্জরী, সুবন্ধুর বাসবদত্তা, সোমদেবের যশস্তিলকচম্পূ, ভাসের স্বপ্নবাসবদত্তম্‌, প্রতিজ্ঞাযৌগন্ধরায়ণ, হর্ষের নাগানন্দ ও রত্নাবলী প্রভৃতির কাহিনী বৃহৎকথা থেকে গৃহীত।

বৃহৎকথাকে উপজীব্য করে পরবর্তীকালে যে তিনটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচিত হয়েছিল সেগুলি হল—বুদ্ধস্বামীর শ্লোকসংগ্রহ, ক্ষেমেন্দ্রের বৃহৎকথামঞ্জরী এবং সোমদেবের কথাসরিৎসাগর।

শ্লোকসংগ্রহ (৮ম—৯ম খ্রিষ্টাব্দ)—নেপালের কবি বুদ্ধস্বামী-রচিত এই গ্রন্থে ২৮টি সর্গে বৃহৎকথার কাহিনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

বৃহৎকথামঞ্জরী (১১শ খ্রিষ্টাব্দ)— কবি ক্ষেমেন্দ্র  বৃহৎকথার গল্পগুলি সংক্ষেপ করে এই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করেছেন।

কথাসরিৎসাগর (১১শ খ্রিষ্টাব্দ)— কাশ্মীররাজ অনন্তের সভাকবি সোমদেবের এই গ্রন্থের রচয়িতা। গ্রন্থটি দশটি লম্বকে বিভক্ত। লম্বকগুলি তরঙ্গে বিভক্ত। এখানে মোট ৬৬টি তরঙ্গ আছে। উল্লেখযোগ্য কাহিনী—মৃগাবতী, শ্রীদত্ত-মৃগাঙ্কবতী, বাসবদত্তা, নরবাহনদত্ত, শক্তিদেব, রাজা বিক্রমাদিত্য, বীরবাহু, ব্রহ্মরাক্ষস, তপোদত্ত, অশোকমালা প্রভৃতির কাহিনী।

বেতালপঞ্চবিংশতি—শিবদাস-রচিত বেতাল ও বিক্রমাদিত্য বিষয়ক ২৫টি গল্পের সংকলন। এক সন্ন্যাসীর প্রয়োজন-সাধনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাজা বিক্রমাদিত্য শ্মশানস্থ একটি গাছ থেকে বেতালাশ্রিত এক শবকে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার সময় বেতাল তাকে একটি করে বলে গল্পে বর্ণিত সমস্যার সমাধান করতে বলে। রাজা যথাযথ উত্তর দিলে বেতাল তাঁর মৌনভঙ্গের সুযোগে আবার গাছে উঠে যায়। এইভাবে ২৫টি রাত অতিবাহিত হয়। বেতাল রাজার পাণ্ডিত্য ও বীরত্বে প্রীত হয়ে তাঁকে সন্ন্যাসীর কপট উদ্দেশ্যের কথা জানায়। পরে বেতালের পরামর্শে রাজা সন্ন্যাসীকে হত্যা করে সিদ্ধিলাভ করেন।

সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা—(১২শ-১৩শ খ্রিষ্টাব্দ)—কালিদাস, সিদ্ধসেন, রামচন্দ্র, দিবাকর, ক্ষেমঙ্কর প্রমুখ কবিদের নামে প্রচলিত গ্রন্থটি রাজা বিক্রমাদিত্য-বিষয়ক ৩২টি গল্পের সংকলন। কাহিনী অনুসারে ধারা নগরীর রাজা ভোজ ভূগর্ভে প্রোথিত রাজা বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন উদ্ধার করেন। তিনি সিংহাসনটির সংস্কার সাধন করে যখন তার উপর বসতে যাবেন, তখন সিংহাসনগাত্রে খোদিত ৩২ টি নারীমূর্তিধারী পুতুল জীবন্ত হয়ে প্রত্যেকে রাজা বিক্রমাদিত্যের গুণ সম্বন্ধে একটি করে গল্প বলে। এই গল্পগুলিই এখানে স্থান পেয়েছে।

শুকসপ্ততি (১২শ খ্রিষ্টাব্দ)—চিন্তামণিভট্ট-রচিত ৭০টি গল্পের সংকলন। গল্পের বক্তা এক শুকপাখি। এক শ্রেষ্ঠীপত্নীকে অবৈধ প্রণয়ের ব্যাপার থেকে নিবৃত্ত করার জন্য তার ঘরে পোষা এক শুকপাখি ৭০ রাতে ৭০টি গল্প বলে। এই গল্পগুলিই এখানে স্থান পেয়েছে।

পুরুষপরীক্ষা—প্রখ্যাত বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি-রচিত ৪৪টি গল্পের সংকলন। এখানে পুরুষোচিত গুণাবলীর প্রশংসাব্যঞ্জক কিছু আকর্ষণীয় লোককাহিনী সন্নিবেশিত হয়েছে।

ভোজপ্রবন্ধ (১৬শ খ্রিষ্টাব্দ)— বল্লাল বা বল্লভ-রচিত এই গ্রন্থে ধারারাজ্যের ভোজকে কেন্দ্র করে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ কিছু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির চরিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। লেখক স্থান-কালের ঔচিত্য লঙ্ঘন করে কালিদাস, ভবভূতি, মাঘ, মল্লিনাথ প্রমুখ ব্যক্তিত্বকে একত্র উপস্থিত করেছেন।
উপরে উল্লিখিত গল্পসংকলনগুলি ছাড়াও অনন্ত-রচিত বীরচরিত, শিবদাসের শালিবাহনচরিত,  অজ্ঞাতনামা লেখকের বীরসেনাচরিত, শালিবাহনচরিত, রাজশেখরের প্রবন্ধকোশ, মেরুতুঙ্গের প্রবন্ধচিন্তামণি প্রভৃতি গ্রন্থ সংস্কৃত সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

উপসংহার-- সংস্কৃত সাহিত্যের গল্পগুলি সামগ্রিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানে বাস্তব ও কল্পনার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। গল্পগুলিতে ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজনীতির আদর্শ গুরুগম্ভীর ও লঘু-চপল বক্তব্য, ব্যঙ্গ-কৌতুক প্রভৃতি সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। গল্পগুলিতে শুধুমাত্র ন্যায়-নীতি, ত্যাগ-সততা প্রভৃতি প্রচারিত হয় নি, অনেক ক্ষেত্রে পশুপাখির রূপকে মানুষের মহত্ব, উদারতা, ভণ্ডামি, শঠতা, হৃদয়হীনতা প্রভৃতি গুণাগুণও পরোক্ষভাবে ব্যক্ত হয়েছে। তাই দেশ-কালের সংকীর্ণ গণ্ডী অতিক্রম করে গল্পগুলি চিরন্তন মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে।
Tales   Fables  এর মূল্যায়ন প্রসঙ্গে Winternitz বলেছেন-- Tales, fables and stories belong to the best productions of the Indian mind and they were elevated to the status of real literature in India earlier and in a much greater measure than among other civilized countries.
------------------

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1