ads

ad

বাল্মীকি-রামায়ণে রামের অভিষেক, লক্ষ্মণের প্রতিবাদ ও কিছু কথা


বাল্মীকি-রামায়ণে
রামের অভিষেক, লক্ষ্মণের প্রতিবাদ ও কিছু কথা

                   বাল্মীকি-রামায়ণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক উপাদান অযোধ্যার সিংহাসনে রামের অভিষেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত একটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি। রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের প্রথমদিকেই রামের যুবরাজপদে অভিষেকের ব্যাপারটি বর্ণিত হয়েছে। ভরত ও শত্রুঘ্ন দুজনেই ভরতের মাতুলালয়ে। কেকয়রাজ অশ্বপতি ভরতের মাতামহ। যুধাজিৎ তাঁর মাতুল।  তাঁরা অত্যন্ত  স্নেহ-যত্নেই সেখানে লালিত হচ্ছেন। তবুও  তাঁরা সবসময় বৃদ্ধ পিতা দশরথের কথা ভাবেন এবং দশরথও তাঁদের কথা ভাবেন। দশরথের কাছে সকল পুত্রই প্রিয় হলেও সমস্ত সদ্‌গুণের আধার বলে রামকে একটু বেশী ভালবাসেন।  তিনি সচিবদের সঙ্গে মন্ত্রণা করে রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সচিবদের কাছ থেকে রামের অত্যধিক জনপ্রিয়তার কথা জেনে, নিজের ভগ্নস্বাস্থ্যের কথা ভেবে, সকলের কল্যাণের জন্য এটাই রামের অভিষেকের উপযুক্ত সময় স্থির করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তা সম্পন্ন করার আদেশ দিলেন।
           
               দশরথ বিভিন্ন নগরের বিশিষ্ট মান্য নাগরিকদের এবং বিভিন্ন দেশের রাজাদের নিম্নত্রণ করে রাজধানীতে নিয়ে এলেন। তাড়াতাড়ি অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ভেবে কেকয়রাজ অশ্বপতিকে (ভরতের মাতামহকে) এবং রাজর্ষি জনককে নিমন্ত্রণ করলেন না, বা সেই সময়ে জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। পরে তাঁদের প্রিয় সংবাদ জানানো হবেসকল  নিমন্ত্রিত রাজা ও অন্যান্য অতিথিরা আসন গ্রহণ করলে দশরথ বলেন—তাঁর শরীর এখন জীর্ণ, তিনি পরিশ্রান্ত, তাই সক্রিয় রাজকার্য থেকে তিনি বিশ্রাম নিতে চান এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রামের হাতে রাজ্যভার ন্যস্ত করতে চান। উপস্থিত সকলেই দশরথের প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং দ্রুত শুভ কাজ সম্পন্ন করতে আবেদন জানান।

               দশরথ কুলগুরু বশিষ্ঠকে অভিষেকের আয়োজন করতে অনুরোধ করেন। বশিষ্ঠ কালবিলম্ব না করে সুমন্ত্র এবং অন্যান্য মন্ত্রীগণকে অভিষেকের জন্য প্রয়োজনীয় সুবর্ণাদি  রত্ন, আহুতিদ্রব্য, সকল প্রকার ঔষধী, আতপ চাল, খই, ঘি, মধু, নববস্ত্র, রথ, আয়ুধ, চতুরঙ্গ বল, শুভলক্ষণযুক্ত হাতী, চামর, ব্যজন, ধ্বজ, শ্বেতচ্ছত্র, একশত স্বর্ণকুম্ভ, সুবর্ণ-শোভিত শৃঙ্গযুক্ত বৃষভ, ব্যাঘ্রচর্ম ইত্যাদি সামগ্রী সংগ্রহ করতে আদেশ দেন। তিনি অন্তঃপুর এবং নগরের সমস্ত দ্বার চন্দন ও মালা দিয়ে সুসজ্জিত করে সুগন্ধি ধূপ দিয়ে সুরভিত করার কথা বলেন। আগামীকাল সকালে শত সহস্র ব্রাহ্মণদের ভোজনের জন্য উৎকৃষ্ট অন্নের সঙ্গে দধি, ঘৃত, ক্ষীর এবং পর্যাপ্ত দক্ষিণার ব্যবস্থা করতে বলেন। আগামীকাল সূ্র্যোদয় হওয়ামাত্রই স্বস্তিবাচন শুরু হবে। বশিষ্ঠের আদেশ অনুসারে সুমন্ত্র অভিষেকের আয়োজনের কোন  ত্রুটি রাখেন নি।
ঐ সময়ে দশরথের দুটি আশঙ্কা ছিল—প্রথমতঃ, তাঁর শরীর দিন দিন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। তিনি অশুভ স্বপ্ন দেখে নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা করছিলেন। দ্বিতীয়তঃ, ভরতের দিক থেকেও তাঁর আশঙ্কা ছিল। তিনি বলেছিলেন—
‘বিপ্রোষিতশ্চ ভরতো যাবদেব পুরাদিতঃ।
তাবদেবাভিষেকস্তে প্রাপ্তকালো   মতো মম।।‘ (অযোধ্যাকাণ্ড—৪/২৫)
ভরত অযোধ্যা থেকে দূরে আছে, এই সময়েই রামের অভিষেককার্য সম্পন্ন হয়ে যায়—এটাই আমার মনোগত ইচ্ছা। তাঁর আশঙ্কা— যদিও ভরত ধর্মশীল, জিতেন্দ্রিয় ও সর্বদা রামের অনুগামী, তবুও ধর্মনিষ্ঠ সাধু ব্যক্তিরও চিত্ত বিচলিত হতে পারে। অথচ ভরত রামের এতটাই অনুগত ও বিশ্বস্ত যে, এইরকম আশঙ্কা নিতান্তই অমূলক
         কৈকেয়ীও রামের অভিষেকের কথা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত। দাসী মন্থরা যখন অসূয়াপরবশ হয়ে তাঁকে রামের অভিষেকের সংবাদ দিয়েছিল, তখন কৈকেয়ী এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি নিজের বহুমূল্য হারটি মন্থরাকে উপহার দিয়েছিলেন। কারণ, কৈকেয়ী রাম ও ভরতের মধ্যে কোন পার্থক্য  করেন নি। ভরতের মতো রামের প্রতিও তিনি সমান স্নেহশীলা ছিলেন—
‘রামে বা ভরতে বাহং বিশেষং নোপলক্ষয়ে
যথা বৈ ভরতো মান্যস্তথা ভূয়োঽপি রাঘবঃ।।‘ (অযোধ্যাকাণ্ড—৭/৩৬)

কৌশল্যাতোঽতিরিক্তং চ মম শুশ্রূষতে বহু।
রাজ্যং যদি হি রামস্য ভরতস্যাপি তত্তদা।।‘ (অযোধ্যাকাণ্ড—৮/১৯-২০)

           রাম তাঁর জন্মদাত্রী মায়ের চেয়েও কৈকেয়ীকে বেশী শ্রদ্ধা করেন কাজেই রাম রাজ্যলাভ করলে তা ভরতেরও হল কিন্তু বিপদ এল অন্যদিক থেকে কৈকেয়ী নিজেই তা বুঝতে পারেন নি কৈকেয়ীর খাস দাসী কুব্জা মন্থরা সে নানা যুক্তি দিয়ে কৈকেয়ীকে বোঝানোর চেষ্টা করেরাম রাজা হলে তার কি  কি  দুরবস্থা হতে পারে কৈকেয়ী প্রথমে মন্থরার কথাকে গুরুত্ব দেয় নি কিন্তু মন্থরার দুটি যুক্তিকে তিনি নস্যাৎ করতে পারলেন না
            প্রথমতঃ, রাজা দশরথ ভরতকে কেন মাতুলালয়ে ফেলে রেখেছেন? রাজ্যে এত বড় একটা আনন্দোৎসব হতে চলেছে, অথচ ভরত ও শত্রুঘ্ন সেখানে থাকবে নাএটা কী করে হতে পারে? রাজার কোন দুরভিসন্ধি না থাকলে তিনি এটা তিনি কখনো করতেন না
            দ্বিতীয়তঃ, কৈকেয়ী বিভিন্ন সময়ে রামের মা কৌশল্যাকে  কষ্ট দিয়েছেন, কৈকেয়ীর আত্মীয়-স্বজনরাও কৌশল্যাকে বারংবার  নিগৃহীত করেছে এখন রাম রাজা হলে কৌশল্যা হবেন রাজমাতা সেদিক থেকে তিনি অনেক বেশী মান্যতা পাবেন কৌশল্যা এতদিনকার অপমান ও উৎপীড়নের প্রতিশোধ নিতে চাইবেন, তখন অযোধ্যা কৈকেয়ীর কাছে কণ্টকশয্যা বলে মনে হবে
        মন্থরার কথায় যুক্তি ছিল কৈকেয়ীর কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হল তাঁর অন্তরের কোপন স্বভাব জাগ্রত হল নিজের আসন্ন দুরবস্থার কথা ভেবে কৈকেয়ী আরো নির্মম হয়ে উঠলেন। তিনি ক্রোধাগারে গিয়ে মলিন বসনে, নিরাভরণ দেহে, কেশ আলুলায়িত করে, গলার হার, পুষ্পমালা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভূমিশয্যা গ্রহণ করলেন।
         এদিকে রামের অভিষেকের আয়োজন সম্পূর্ণ। দশরথ এই প্রিয় সংবাদ জানানোর জন্য কৈকেয়ীর ঘরে গেলেন। তখন সন্ধ্যা আগতপ্রায়। দশরথ তাঁকে শয়নগৃহে না পেয়ে ক্রোধাগারে গেলেন। কৈকেয়ীকে ঐরকম অবস্থায় দেখে তাঁর মান ভাঙানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করলেন। শেষে বললেন—‘অহঞ্চ হি  মদীয়াশ্চ সর্বে তব বশানুগাঃ।‘  আমি এবং আমার যা কিছু সব তোমার অধীন। তুমি যা চাও, তাই তোমাকে দেবএই জগতে তোমার অপ্রাপ্য কিছু নেই।‘ এরপর দশরথ রামের শপথ করে বললেন—‘তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—তুমি যা চাইবে তাই তোমাকে দেব।'
      কৈকেয়ী দশরথের দুর্বলতার কথা জানতেন তিনি সুযোগ বুঝে পূর্বপ্রতিশ্রুত  দুটি  বর চাইলেন—এক বরে ভরতের রাজ্যাভিষেক এবং অন্য বরে রামের চোদ্দ বছরের বনবাস।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে—রাজা দশরথ কৈকেয়ীকে বিবাহ করার সময় কৈকেয়ীর পিতা অশ্বপতির কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, কৈকেয়ীর পুত্রকে তিনি রাজ্য প্রদান  করবেন—
জাতঃ পুত্রো  দশরথাৎ কৈকেয্যাং রাজসত্তমাৎ।
পুরা ভ্রাতঃ পিতা নঃ স মাতরং তে সমুদ্বহন্‌।
মাতামহে সমাশ্রৌষীদ্রাজ্যশুল্কমনুত্তমম্‌।।‘

কৈকেয়ীর এই ক্রূরতাপূর্ণ কথা শুনে দশরথ মুহূর্তকাল মূর্ছিত হয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি বললেন—
‘কিং নু মেঽয়ং দিবাস্বপ্নশ্চিত্তমোহোঽপি বা মম।
অনুভূতোপসর্গো বা মনসো বাপ্যুপদ্রবঃ।।‘ (অযোধ্যাকাণ্ড—১২/২)
--এটা কি আমার দিবাস্বপ্ন, নাকি চিত্তবিভ্রম, না কি পূর্বজন্মে অনুভূত কোন মানসিক উপদ্রব?
দশরথ কতভাবে  কৈকেয়ীকে অনুনয় করলেন যাতে তিনি এইরকম কথা না বলেন কিন্তু কৈকেয়ী তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল শেষে দশরথ বলেন ‘আমার অন্তিমকাল আসন্ন, দীনভাবে তোমার কাছে প্রার্থনা করছিআমাকে দয়া কর পৃথিবীতে প্রাপ্য বস্তুস্মূহের মধ্যে তুমি যা চাও তাই তোমাকে দেব, কিন্তু আমার মৃত্যুস্বরূপ তোমার এই নিদারুণ অভিলাষ ত্যাগ কর তুমি  রামকে রক্ষা কর, অধর্ম যেন আমাকে স্পর্শ না করে।‘
এইভাবে বিলাপ করতে করতে দশরথ কৈকেয়ীর পা ধরতে গিয়ে মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর চেতনা ফিরে পেয়ে কখনো কৈকেয়ীকে তিরস্কার করছেন, কখনো তাঁর পায়ে ধরতে গেছেন, তিনি অসহায়ভাবে আত্মগ্লানিতে ভুগেছেন।
কৈকেয়ী বারবার দশরথকে কঠোর ভাষায় আঘাত করছেন এবং বলছেন—মহারাজ যেন রামকে সেখানে উপস্থিত করেন। তখন দশরথ প্রায় অচেতন। তিনি সহ্য করতে না পেরে বললেন—
‘জ্যেষ্ঠং পুত্রং প্রিয়ং রামং দ্রষ্টুমিচ্ছামি ধার্মিকম্‌।‘—আমি আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রিয় রামকে দেখতে চাই।
               সকালবেলায় সুমন্ত্র এসেছেন দশরথের কাছে। রাজার দৃষ্টি নিষ্প্রভ, মুখ শুষ্ক, তিনি কোন কথা বলতে পারলেন না। কৈকেয়ী বিদ্রূপ করে দশরথ সম্বন্ধে বললেন—‘সুমন্ত্র, রাজা গতরাত রামের অভিষেকের আনন্দে জেগে কাটিয়েছেন, সেইজন্য তিনি এখন ক্লান্ত। তুমি অতি সত্বর রামকে নিয়ে এস।‘
              সুমন্ত্র রামকে নিয়ে এসেছেন। রামের দেহরক্ষীরূপে লক্ষ্মণও এসেছেন। রাম দশরথ ও কৈকেয়ীকে উৎকৃষ্ট আসনে উপবিষ্ট দেখলেন। দশরথ অত্যন্ত বিষণ্ণ, তাঁর চেহারা মলিন। রাম তাঁকে অভিবাদন জানালেন। দশরথ শুধু বললেন ‘রাম’, এছাড়া তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। তাঁর চোখে জল, রামকে ঠিকমতো দেখতে পেলেন না। রাম দশরথের বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞাসা করলে কৈকেয়ী কৈকেয়ী দশরথ-প্রদত্ত পূর্ব প্রতিশ্রুতি এবং এখন তা পূরণের কথা বলেন। তিনি আরো বলেন— ‘যতক্ষণ পর্যন্ত রাম দণ্ডকারণ্যে যাত্রা না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজা স্নানাহার করবেন না।‘ কৈকেয়ীর এই হৃদয়বিদারক কথা শুনে দশরথ ‘ধিক্‌ কষ্টম্‌’ বলে পালঙ্কেই মূর্ছিত হয়ে পড়লেন।
রাম কৈকেয়ীর মুখ থেকে দশরথের বরদানের কথা শুনে কোন দ্বিধা না করে বললেন—
‘এবমস্তু গমিষ্যামি বনং বস্তুমহং ত্বিতঃ।
জটাচীরধরো রাজ্ঞ প্রতিজ্ঞামনুপালয়ন্‌।।‘ (অযোধ্যাকাণ্ড—১৯/২)
--আমি রাজার প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য জটা-চীর ধারণ করে বনগমনের জন্য এখনই এখান থেকে চলে যাব।‘  সেইসঙ্গে রাম খেদের সঙ্গে বললেন—
‘অলীকং মানসন্তেকং হৃদয়ং দহতীব মে।
স্বয়ং যন্নাহং মাং রাজা ভরতস্যাভিষেচনম্‌।।‘ (অযোধ্যাকাণ্ড—১৯/৬)
--এই একটি দুঃখ আমার হৃদয়কে যেন দগ্ধ করে দিচ্ছে—রাজা নিজে কেন আমাকে ভরতের অভিষেকের কথা বললেন না।‘
         এরপর রাম বনগমনের উপযুক্ত বেশ পরে দশরথের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার উদ্দেশ্যে সীতা ও লক্ষ্মণসহ পুনরায় কৈকেয়ীর ভবনে আসেন। দূর থেকে তাঁদের দেখে দশরথ  তাড়াতাড়ি রামের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু একটু এগিয়েই মূর্ছিত হয়ে যান তাঁরা তাঁকে তুলে পালঙ্কে শুইয়ে দেন চেতনা ফিরে পেয়ে দশরথ রামকে বলেন— ‘বৎস, আমি বরদানের ব্যাপারে কৈকেয়ীর দ্বারা মোহগ্রস্ত হয়েছি, তুমি আমাকে নিগৃহীত করে অযোধ্যার রাজা হও।‘ রাম হাত জোড় করে বনগমনের জন্য প্রার্থনা করলে দশরথ কাঁদতে থাকেন। অসহায়ভাবে তিনি বলেন—
‘তুমি ধার্মিক ও সত্যনিষ্ঠ, তোমার বুদ্ধিকে পরিবর্তিত করার শক্তি আমার নেই। তুমি সর্বাধিক কল্যাণ লাভের জন্য এবং পুনরায় আগমনের জন্য অকুতোভয়ে নিরাপদে যাত্রা কর।‘
 দশরথ সেইসঙ্গে এটাও বলেন—‘তোমার বনগমন আমার অভিপ্রেত নয়, আমি কৈকেয়ীর দ্বারা বঞ্চিত হয়েছি, তুমি আমার সত্য রক্ষার জন্যই এই দুষ্কর কর্মে প্রবৃত্ত হয়েছ।‘
                লক্ষ্মণ রামের একনিষ্ঠ সেবক, সকল কার্যের অনুবর্তী। তিনি দশরথের এই অন্যায় বরদান মেনে নিতে পারেন নি। প্রচলিত নিয়ম অনুসারে রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্রই রাজা হবেন, ভরত জ্যেষ্ঠ পুত্র নন, কাজেই কী করে তিনি  যুবরাজপদে  অভিষিক্ত হতে পারেন? তিনি প্রতিবাদ করলেন।
রামের পিতৃসত্য পালনকেও ধর্মবিরুদ্ধ বললেন। রাম বলেন—এটা দৈবশক্তির প্রভাব।   দৈবশক্তিকে অতিক্রম করার শক্তি কারো নেই। দৈবের উপর কারো হাত নেই। লক্ষ্মণ মানতে পারলেন না কথাটা। রামের কথার প্রতিবাদ করে তিনি বললেন—‘অতি দীন ও অশক্ত ব্যক্তিরাই দৈবের দোহাই দিয়ে থাকে। যারা পুরুষকার  দ্বারা দৈবের প্রতিকূলতা দূর করতে সচেষ্ট হন, তাঁরা আপনার মতো অবসন্ন হয়ে পড়েন না, মৃদু ব্যক্তিরাই পরাভব স্বীকার করে।‘
         লক্ষ্মণ রামকে প্রশ্ন করেন— ‘আমাদের পিতা ধর্ম ও  সত্যের ভাণ করে আপনার বিরুদ্ধে অন্যায় করছেন, তা কি আপনি বুঝতে পারছেন না? আপনার মতো দেবতুল্য, সরল ও সংযত পুত্রকে তিনি বিনা অপরাধে বনে নির্বাসিত করছেন, অথচ আপনি পিতৃসত্যরূপ  ধর্ম  পালনে উৎসুক। এই ধর্ম আমার কাছে অধর্ম বলে মনে হচ্ছে। যে রাজা স্ত্রীর বশবর্তী হয়ে নিজের নিরপরাধ পুত্রকে বনবাসে পাঠান—তাকে কী করে সত্যধর্ম পালন করা বলে? আমি আজ বাহুবলে আপনার অভিষেক করাব। কার সাধ্য আমাকে প্রতিরোধ করে?’
রামের প্রতি অত্যধিক আনুগত্যবশতঃ  লক্ষ্মণ একসময় তিনি হিতাহিত-জ্ঞানশূন্য হয়ে শিষ্টাচার বিসর্জন দিয়ে ছলছল চোখে বলেন--
‘হনিষ্যে পিতরং বৃদ্ধং কৈকেয্যাসক্তমানসম্‌।
কৃপণং চ স্থিতং বাল্যে বৃদ্ধভাবেন গর্হিতম্‌।।‘ (অযোধযাকাণ্ড—২১/১৯)
--আমি কৈকেয়ীতে আসক্ত বৃদ্ধ পিতাকে হত্যা করব।
‘ধর্মহানির আশঙ্কায় এবং পিতৃবাক্য পালন না করলে লোকমর্যাদা লঙ্ঘনের আশঙ্কায় বনগমনে আপনার যে ব্যগ্রতা দেখছি, তা একান্ত অসঙ্গত। আপনার মতো বীর ক্ষত্রিয়ের মুখে এই সকল কথা শোভা পায় না। মহারাজ ও কৈকেয়ী অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছেন, তবুও আপনি তাঁদের থেকে কোনরকম আশঙ্কা করেন না? তাঁদের কোনরকম ছলনা না থাকলে অনেক আগেই  কৈকেয়ী বর চাইতে পারতেন। যে ধর্মের দ্বারা আপনার এই মোহ উপস্থিত হয়েছে, সেই ধর্মকে আমি বিদ্বেষ করি। কৈকেয়ীর বশীভূত রাজার অন্যায় আদেশ আপনি কেন পালন করবেন? কপটতার দ্বারা আপনার রাজ্যাভিষেক পণ্ড করা হয়েছে, কিন্তু আপনি গর্হিত কাজকেই ধর্ম বলছেন—এটাই আমার দুঃখ। এইরকম সাধুজন-নিন্দিত কর্মে ধর্মভাব আরোপ করা অনুচিত।‘
রাম দৈবের কথা বললে লক্ষ্মণ বলেন—
‘বিক্লবো বীর্যহীনো যঃ স দৈবমনুবর্ততে।
বীরাঃ সম্ভাবিতাত্মানো ন দৈবং পর্যুপাস্যতে।।
দৈবং পুরুষকারেণ যঃ সমর্থঃ প্রবাধিতুম্‌।
ন দৈবেন বিপন্নার্থঃ পুরুষঃ সোঽবসীদতি।‘  (অযোধযাকাণ্ড—২৩/১৬-১৭)
--দুর্বল ব্যক্তিরাই দৈবের কথা বলে থাকেন, যারা বীর ও সংসারে পুরুষ বলে সম্মানিত, তাঁরা কখনো দৈবের উপাসনা করেন না। আমার বাহুদুটি শোভাবৃদ্ধির জন্য নয়, এই ধনু অলঙ্কাররূপে ধারণ করি নি, এই খড়্গ কটিদেশে ধারণ করার জন্য নয় এবং বাণগুলি শুধু তূণেই শোভা পাবে না। আপনি আদেশ করুন, আজ মহারাজ দশরথের  প্রভুত্বের বিলোপ এবং আপনার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। আমি আপনার ভৃত্য।‘
ক্ষোভে, দুঃখে, ক্রোধে লক্ষ্মণের চোখ অশ্রুসিক্ত। রাম স্নেহের স্পর্শে লক্ষ্মণের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেন—‘সৌম্য ভ্রাতঃ, তুমি স্থির জেনো যে, আমি পিতার বাক্যপালনে দৃঢ়সংকল্প থাকব।‘

            কৈকেয়ী রাজা দশরথের নর্ম বিবাহের স্ত্রী। নর্ম বিবাহে প্রতিশ্রুতিভঙ্গ দোষাবহ নয়। মহাভারতের আদিপর্বে (৮২/১৬) বলে হয়েছে—
‘ন নর্মযুক্তং বচনং হিনস্তি
ন স্ত্রীষু রাজন্‌ বিবাহকালে।
প্রাণাত্যয়ে সর্বধনাপহারে
পঞ্চানৃতান্যাহুরপাতকানি।।
---স্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তায়, বিয়ের সময় আলাপ-আলোচনায়, প্রাণনাশের আশঙ্কায় এবং সর্বস্ব বিনাশের আশঙ্কাস্থলে মিথ্যাভাষণ দোষের নয়।
শ্রীমদ্ভাগবতেও বলা হয়েছে—
‘স্ত্রীষু নর্মবিবাহে চ বৃত্ত্যর্থে প্রাণসঙ্কটে।
গোব্রাহ্মণার্থে নানৃতং স্যাজ্জুগুপ্সিতম্‌।।‘ (৮.১৯.৪৩)
কাজেই দশরথ যদি কৈকেয়ীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন না করতেন, তাতেও তাঁকে দোষ দেওয়া যেত না। কিন্তু দশরথ সত্যসন্ধ, তাঁর আদর্শ, মূল্যবোধ তাঁকে ছলনা বা কপটতার আশ্রয় নিতে দেয় নি। তাই কোন এক দুর্বল মুহূর্তে করা সেই প্রতিজ্ঞার জন্য তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল। তিনি সেই সত্যধর্ম থেকে বিচ্যুত হতে চান নি। তাই কৈকেয়ীকে বারবার অনুরোধ করেছেন যাতে কৈকেয়ী নিজেই তার শিষ্টাচার-বহির্ভূত বরপ্রার্থনা থেকে বিরত হন। দশরথ কৈকেয়ীকে বলেন—‘তুমি  যদি তোমার স্বামীর, প্রজাদের ও ভরতের কল্যাণ চাও, তাহলে সেই পাপসংকল্প পরিত্যাগ কর। যারা রামের অভিষেকে আনন্দিত হয়েছেন, তারা এখন বলবেন—এই চঞ্চলমতি বৃদ্ধ কীভাবে এতদিন রাজ্যশাসন  করলেন? আমি কীভাবে লোকসমাজে মুখ দেখাব?’
দশরথ অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে নিজেকে ধিক্কার দেন—‘হায়, আমি অতি মূর্খ, পাপী, দুরাত্মা। আমি জীবিত অবস্থায় রামকে পিতৃহীন করলাম। সকলেই বলবে—আমি অতি নির্বোধ, স্ত্রীর কথায় প্রাণাধিক পুত্রকে নির্বাসিত করছি।‘
         দশরথ জানেন—রাম তাঁর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। তাঁকে কোন অবস্থাতেই সত্যভ্রষ্ট হতে দেবেন না, তা যত অন্যায়ই হোক। উপায়ান্তর না দেখে দশরথ বলেন—‘রাম যদি বনগমনের আদেশ পেয়ে তা অগ্রাহ্য করে, তাহলে খুব ভাল হয়। কিন্তু রাম তো তা করবে না। এর ফলে আমার মৃত্যু হবে, সেইসঙ্গে কৌশল্যা ও সুমিত্রারও জীবন শেষ হবে।‘
         একদিকে রামের বিচ্ছেদ, অন্যদিকে লোকলজ্জা—এই দুটি আঘাতে দশরথ অত্যন্ত কাতর হয়েছেন, অথচ অধর্ম হবে –এই ভয়ে কৈকেয়ীকে বরদানের প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ  করতে চান নি। বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বে দশরথ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাই অসহায়ভাবে তিনি কৈকেয়ীকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি করজোড়ে কৈকেয়ীর কাছে দয়া ভিক্ষা করেছেন, সারারাত কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখ রক্তবর্ণ, বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন, কিন্তু কৈকেয়ী তাঁর লক্ষ্যে অবিচল। তিনি দশরথের কোন কথাতেই কর্ণপাত করলেন না। দশরথ তীব্র ঘৃণায় কৈকেয়ীকে বলেন—‘আমি আমার ঔরসজাত তোমার পুত্রকেও পরিত্যাগ করছি।'
দশরথের মোহগ্রস্ততা, প্রতিশ্রুতিপালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, রামের মতো ধার্মিক, সত্যসন্ধ, বীর প্রাণাধিক পুত্রকে রাজ্যলাভ থেকে বঞ্চিত করে চোদ্দ বছরের জন্য শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে নির্বাসনদান ইত্যাদি ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে দশরথের চরিত্রের দুর্বলতর দিক বলে মনে হলেও রামায়ণের নীতি-আদর্শের সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ।
                   রামায়ণ গৃহস্থাশ্রমের কাব্য। এখানে ঘরের কথাকেই বড় করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেই ঘর যেমন হৃদয়হীনতা, ঈর্ষ্যাকুটিলতা, নীচাশয়তা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি দোষে কলুষিত, তেমনি ত্যাগ, দয়া, ক্ষমা, সত্যধর্ম পালন প্রভৃতি মহত্তর গুণে পরিপূর্ণ। অসৎ সাময়িকভাবে  সৎ-এর উপর প্রভুত্ব করলেও পরিণামে সৎ-এরই জয় হয়। রামায়ণ ভারতবর্ষের এই উচ্চ আদর্শকেই নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
                 লক্ষ্মণ নির্দোষ রামের  বনগমন এবং পিতার অন্যায় প্রতিশ্রুতিপালনের যে প্রতিবাদ করেছেন তা সকল যুক্তিবাদী মানুষেরই কথা। লক্ষ্মণ একটা উপলক্ষ্যমাত্র।  কৈকেয়ীর বরপ্রার্থনার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে  সাধারণভাবে যে কোন বিবেকবান্‌ মানুষের যা করা উচিৎ, লক্ষ্মণও তাই করেছেন। মোহগ্রস্ত বৃদ্ধ রাজার কোন এক দুর্বল মুহূর্তে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সুযোগ নিয়ে কৈকেয়ী তাঁর পুত্র ভরত  এবং  নিজের ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক ও সুরক্ষিত করার জন্য যে কাজটা করেছেন, তাতে স্বার্থপরতা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা থাকলেও সেইরকম ঘটনা রাজ-অন্তঃপুরে স্বাভাবিকভাবেই ঘটে থাকে। কিন্তু রাম-লক্ষ্মণ-ভরত- শত্রুঘ্ন-সমন্বিত দশরথের যে সুখী সংসার, তার মধ্যে এই উৎপাত কাম্য নয়। তাই লক্ষ্মণের এই বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। লক্ষ্মণের ব্যক্তিগত কোন জীবন নেই। রামের জন্য তিনি নিবেদিতপ্রাণ, আত্মসমর্পিত। রামের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিয়েছেন। তাই রামের বিরুদ্ধে সঙ্ঘটিত সামান্যতম অন্যায়ও তিনি মানতে পারেন নি।
           রামের অভিষেক ব্যাপারকে কেন্দ্র করে বাল্মীকি যে দুটি আদর্শের দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন তা অত্যন্ত উচ্চ কোটির। দশরথের চরিত্রে অনেক দুর্বলতর দিক থাকলেও কেবলমাত্র প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য এত বড় ত্যাগ আমাদের প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে আঘাত করে। তিনি অসহায়ভাবে কৈকেয়ীকে কাকুতি-মিনতি করেছেন যাতে রামের বনগমনরূপ অনিষ্ট নিবারণ করা যায়। কৈকেয়ী সম্মত না হওয়ায় তাঁর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। রাম যাতে বলপ্রয়োগে রাজ্য অধিকার করেন, সেই বিষয়েও তিনি রামকে প্রস্তাব দেন, অথচ কোনভাবেই নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসেন নি। তিনি যুক্তি দিয়ে বিচার করে বা বলপ্রয়োগ করে  কৈকেয়ীর দাবিকে অগ্রাহ্য করতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেই পথে হাঁটেন নি।  সত্যধর্ম পালনের জন্য দশরথের এই অবিচল নিষ্ঠার কাছে লক্ষ্মণের ন্যায্য প্রতিবাদও তুচ্ছ হয়ে যায়। সংসারে সকলের কল্যাণের জন্য যা করা উচিৎ, লক্ষ্মণ তাই করেছেন এবং তাই ঘটাতে চেয়েছেন, কিন্তু সত্যধর্মের আদর্শের কাছে প্রচলিত ন্যায়ধর্মের আদর্শ (রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা হবেন) ম্লান হয়ে গেছে। এইভাবে দুই আদর্শের দ্বন্দ্বে সত্যধর্মেরই  জয় ঘোষণা করা হয়েছে।

                                  ------

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1