ads

ad

ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব


. ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব

ভূমিকাভারতবর্ষের শিক্ষা, সভ্যতা ও অধ্যাত্মচেতনার মূর্ত প্রতীক মহাভারত। কেউ কেউ এই কাব্যকে বলেছেন ‘পুরাণ’, কেউ কেউ বলেছেন ‘পুরাণেতিহাস’, ব্যাসদেব বলেছেন—‘কাব্যং পরমপূজিতম্‌’। Winternitz বলেছেন--"a whole literature.' ধর্মশাস্ত্র, কামশাস্ত্র, মোক্ষশাস্ত্র ইত্যাদি রূপেও এই কাব্য প্রশংসিত ভারতসংহিতা, পঞ্চমবেদ, শতসাহস্রীসংহিতা, জয়, ভারত, সংহিতা, আখ্যান, উপাখ্যান ইত্যাদিরূপেও এই গ্রন্থ অভিহিত সমগ্র মহাভারতে শতসহস্র বা এক লক্ষ শ্লোক আছে, সেইজন্য একেশতসাহস্রীসংহিতাবলা হয়
সমগ্র মহাভারত কোন এক যুগে রচিত হয় নি পণ্ডিতগণ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের সাহায্যে অনুমান করেছেন মহাভারত তিনটি স্তরে রচিত হয়েছিল যথা
প্রথম স্তরআনুমানিক ৭০০-৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
দ্বিতীয় স্তরআনুমানিক ৫০০-২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
তৃতীয় স্তরআনুমানিক ২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৫০ খ্রীষ্টাব্দ

ভারতীয় জীবন ও সংস্কৃতিতে মহাভারতের প্রভাব—
মহাভারত যুগ যুগ ধরে ভারতবর্ষের জনজীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করে আসছে। একদিকে যেমন মহাভারতের চরিত্রগুলির প্রভাব মানুষের জীবনে পড়েছে, তেমনি অন্যদিকে ধর্ম, কর্ম ও ভক্তিজগতেও এর প্রভাব পড়েছে। ধর্মনিষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের উদার চরিত্র, অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা অর্জুনের পুরুষকার, ভীমের ক্ষাত্রতেজ এবং সর্বোপরি যুধিষ্ঠিরের প্রতি অন্য ভাইদের আনুগত্য প্রতিটি মানুষের অনুসরণীয়। দ্রৌপদীর ক্ষত্রিয়োচিত তেজ, গান্ধারীর ধার্মিকতা, কুন্তীর ধর্মনিষ্ঠা ইত্যাদি নারীকুলের আচরণীয় ধর্ম। আবার, সূতপুত্র কর্ণ তাঁর দৈবায়ত্ত জন্মকে উপেক্ষা করে পৌরুষ ও দানের কৃতিত্ব ঘোষণা করেছেন। এছাড়া ভীষ্মের আত্মত্যাগ, বিদুরের নীতিপরায়ণতা প্রভৃতি ভারতীয় জীবনে চিরকাল নৈতিক প্রেরণা যুগিয়ে আসছে।
শ্রীকৃষ্ণের ধর্মস্থাপনের জন্য অবিচ্ছেদ্য মহাভারত গঠনের প্রচেষ্টা এবং গীতার মর্মবাণী আমাদের কর্মজীবনে ও ভাবজীবনে শাশ্বত প্রভাব বিস্তার করেছে। গীতার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমানবের আদরের সম্পত্তি হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রগুলির মধ্যে যে আপাত বিরোধ আছে, সেই সব বিরোধের মীমাংসা করে গীতা সমস্ত মত ও পথের সমন্বয়সাধন করেছে। নীতিশাস্ত্র হিসাবে, দর্শন হিসাবে ও ইতিহাস হিসাবে মহাভারত ভারতীয় জীবনে ও সংস্কৃতিতে অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছে।

ভারতীয় সাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব—
ভারতবর্ষের সাহিত্যক্ষেত্রেও মহাভারতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। খ্রীষ্টপূর্ব যুগ থেকে খ্রীষ্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতক পর্যন্ত অসংখ্য কাব্য, নাটক, মহাকাব্য, চম্পূকাব্য প্রভৃতি রচিত হয়েছে। উক্ত রচনাগুলির মধ্যে প্রধান হল—
মহাকাব্য--  ভারবির কিরাতার্জুনীয়, মাঘের শিশুপালবধ, ক্ষেমেন্দ্রের মহাভারতমঞ্জরী, নীতিবর্মার কীচকবধ, বাসুদেবের যুধিষ্ঠিরবিজয়, শ্রীহর্ষের নৈষধচরিত, বস্তুপালের নরনারায়নানন্দ, অমরচন্দ্র সূরির বালভারত প্রভৃতি মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে রচিত।

নাট্যকৃতি—ভাসের মধ্যমব্যায়োগ, দূতবাক্য, ঊরুভঙ্গ, কর্ণভার, দূতঘটোৎকচ ও পঞ্চরাত্র;
কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল, ভট্টনারায়ণের বেণীসংহার, কুলশেখরের তপতীহরণ ও সুভদ্রাধনঞ্জয়, প্রহ্লাদনদেবের পার্থপরাক্রম, বৎসরাজের সমুদ্রমন্থন, কাঞ্চনপণ্ডিতের ধনঞ্জয়বিজয়, কুমারপালের দ্রৌপদীস্বয়ংবর, রামচন্দ্রের নি্র্ভয়ভীম, মোক্ষাদিত্যের ভীমবিক্রমব্যায়োগ প্রভৃতি মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে রচিত।
চম্পূকাব্য—মহাভারত অবলম্বনে রচিত উল্লেখযোগ্য চম্পূকাব্যগুলি হল—ত্রিবিক্রম ভট্টের নলচম্পূ, অনন্ত ভট্টের ভারতচম্পূ, চক্রকবির দ্রৌপদীপরিণয়, অম্মলকবির রুক্মিণীপরিণয়, সুভদ্রাহরণ প্রভৃতি।

বৌদ্ধ ও জৈনসাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব
বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মাচার্য মহাভারতের কাহিনীর আদর্শে কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিধুরপণ্ডিত-জাতকে অংকিত বিধুর চরিত্রটি মহাভারতের বিদুরের আদর্শে পরিকল্পিত। ঘটজাতকে কৃষ্ণের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
জৈন কবিগণও মহাভারত অবলম্বনে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—জিনসেন-রচিত হরিবংশপুরাণ, গুণভদ্রের উত্তরপুরাণ, শিলাচার্যের চৌপন্ন মহাপুরিসচরিঅ, শুভচন্দ্রের জৈনমহাভারত বা পাণ্ডবপুরাণ প্রভৃতি।

বাংলা সাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব—বাংলায় কাশীরাম দাস-রচিত মহাভারত ঘরে ঘরে পঠিত হয়। মাইকেল মধুসূদনদত্তের শর্মিষ্ঠা, হেমচন্দ্রের বৃত্রসংহারকাব্য, গিরিশচন্দ্র ঘোষের পাণ্ডবগৌরব, পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা, গান্ধারীর আবেদন, কর্ণকুন্তীসংবাদ প্রভৃতি মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে রচিত।

উপসংহার— মহাভারত আমাদের জাতীয় জীবনের মূলাধার, আমাদের সমাজ ও সাহিত্যে সার্থক রসসঞ্চারী এবং আমাদের অন্তরের মর্মবাণী। যুগে যুগে এই বাণী অক্ষয় শান্তি বয়ে আনে। কাশীরাম দাস যথার্থই বলেছেন—‘মহাভারতের কথা অমৃতের সমান’। মহাভারতের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে Winternitz বলেছেন--
"It is only in a very restricted sense that we may speak of the Mahabharata as an epic and a poem. Indeed in a certain sense, the Mahabharata is not one poetic production, but a whole literature.'
Annie Besant বলেছেন-- "The Mahabharata is the greatest poem in the whole world. There is no other poem so splendid as this, so full of what we want to know, and what it is good for us to study.'
......

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1