ads

ad

সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি-বিষয়ক মতবাদ (Various theories on the origin of Sanskrit drama.)


সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি-বিষয়ক মতবাদ  (Various theories on the origin of Sanskrit drama.)

      সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তির ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত প্রাচীন ভারতের কোন যুগে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছিল সেই প্রশ্নের আজও কোন যুক্তিসঙ্গত উত্তর পাওয়া যায় নি প্রাচীন নাট্যতাত্ত্বিক, আধুনিক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতগণ সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি বিষয়ে যে সব সিদ্ধান্তে এসেছেন তাতে মূল দুটি চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়েছেএকটি ধর্মানুষ্ঠান-কেন্দ্রিক এবং অন্যটি লৌকিক অনুষ্ঠান সম্পর্কিত। নীচে সেই মতবাদগুলি আলোচিত হল।

দৈব উৎপত্তি মতবাদ— ভরতের নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত নাটকের উৎপত্তি সম্পর্কে মতবাদকে দৈব উৎপত্তিবাদ বলা হয়। এই মতবাদ অনুসারে দেবরাজ ইন্দ্র দর্শন ও শ্রবণের আনন্দ বিধানের জন্য একখানি পঞ্চমবেদ সৃষ্টির আবেদন নিয়ে ব্রহ্মার কাছে যান। ব্রহ্মা সেই অনুরোধ রক্ষার্থে ঋগ্বেদ থেকে সংলাপ, সামবেদ থেকে গান, যজুর্বেদ থেকে অভিনয় এবং অথর্ববেদ থেকে রস সংগ্রহ করে নাট্যবেদ তৈরি করলেন। সেই বিষয়ে নাট্যশাস্ত্র বলা হয়েছে—
‘জগ্রাহ পাঠ্যমৃগবেদাত্‌ সামভ্যো গীতমেব চ।
যজুর্বেদাদভিনয়ান্‌ রসানাথর্বণাদপি’।।
শিব-পার্বতী দান করলেন তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য, বিষ্ণু দিলেন রীতি। ব্রহ্মা কল্পনাশক্তিতে অপ্সরাদের সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মার নির্দেশে ভরত ইন্দ্রধ্বজ উৎসবে স্বর্গ ও মর্ত্যের কলাকুশলীদের নিয়ে নাটক অভিনয়ের ব্যবস্থা করলেন। নির্বিঘ্নে অভিনয় সম্পন্ন করার জন্য ব্রহ্মার আদেশে বিশ্বকর্মা তৈরি করলেন রঙ্গমঞ্চ। ভরতের নির্দেশনায় অভিনীত হল ব্রহ্মা-রচিত দুটি নাটক—অমৃতমন্থন ও ত্রিপুরদাহ। কালক্রমে ভরতের শিষ্যরাই পৃথিবীতে নাটকের প্রচলন করলেন।

ঋগ্বেদের সংবাদসূক্তে নাটকের বীজ
ঋগ্বেদে প্রায় ২০টি সংবাদসূক্ত আছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—যম-যমী-সংবাদ, পুরূরবা-উর্বশী সংবাদ, অগস্ত্য-লোপামুদ্রা-সংবাদ, সরমা-পণি-সংবাদ প্রভৃতি। বিখ্যাত পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিত Keith, Von Schroeder, Max Muller প্রমুখ মনে করেন-- ঋগ্বেদের সংবাদসূক্ত থেকেই সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছে। তাঁরা এই সূক্তগুলিকে ritual drama, mystery play, ballad play ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছেন।
Max Muller মনে করেন—বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানে কেউ ইন্দ্র, কেউ মরুৎ ইত্যাদি সেজে অভিনয় করত। এর সঙ্গে বৈদিক অনুষ্ঠানের নৃত্য ও গীত যুক্ত হয়। এইভাবে সংবাদসূক্তগুলি পূর্ণাঙ্গ নাটকে পরিণত হয়।

বেদের কর্মকাণ্ডে নাটকের বীজ
বৈদিক কর্মকাণ্ডের কয়েকটি অনুষ্ঠানে নাটকীয় ব্যাপার লক্ষ করা যায়। সোমযাগের অন্তর্গত সোমক্রয় অনুষ্ঠানে জনৈক শূদ্রের কাছ থেকে অধ্বর্যু নামক পুরোহিত বিনামূল্যে সোমক্রয় করতেন। বিক্রেতা মূল্য চাইলে পুরোহিত তাকে প্রহার করতেন। দু’জন পুরোহিত এই দু’জনের ভূমিকায় অভিনয় করতেন।  
মহাব্রতযাগে একটি গোলাকার চর্মখণ্ড নিয়ে বৈশ্য ও শূদ্রের বিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্যের বিজয় দেখানো হত। কোন কোন পণ্ডিতের মতে এই অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে প্রাচীন নাট্যাভিনয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যায়।

রামায়ণ ও মহাভারতে নাটকের বীজ
রামায়ণ ও মহাভারতে নট, নাটক, নর্তক, গায়ক, শৈলূষ, ব্যামিশ্রক প্রভৃতি শব্দের উল্লেখ আছে, নাট্যরচনা ও নাট্যাভিনয়-সম্পর্কিত কোন আলোচনা নেই। মহর্ষি বাল্মীকির কাছ থেকে রামায়ণ কাহিনী শুনে লব-কুশ রামায়ণ গান করেছেন। আবার, ‘কুশীলব’ বলতে নাটকের পাত্রপাত্রীকে বোঝায়। কেউ কেউ মনে করেন ‘শৈলূষ’ এর অর্থ নট বা অভিনেতা। ‘ব্যামিশ্রক’ শব্দটিও সম্ভবতঃ মিশ্র ভাষায় রচিত নাটক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। 

ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নাটকের উৎস-সন্ধান
কতিপয় পণ্ডিত মনে করেন—বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় নিজ নিজ আরাধ্য দেবতার কাহিনী অবলম্বনে নাট্যসাহিত্য এবং নাট্যাভিনয়ের প্রবর্তন করেন। Winternitz মনে করেন—কৃষ্ণভক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রথম নাটকের প্রবর্তন হয়। কৃষ্ণলীলা কাহিনীর নৃত্যগীত হতকেই সম্ভবতঃ নাট্যাভিনয়ের উৎপত্তি হয়েছে।
Sylvian Levy-ও অনুরূপ মত পোষণ করেন। Berth সাহেব Levyর মত সমর্থন Block সাহেব মনে করেন—শৈব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম নাটকের বিকাশ হয়।
Dr. Ridgeway মনে করেন—মৃত পূর্বপুরুষ-পূজার অনুষ্ঠান থেকে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছে।
এই সকল মতবাদের মূলে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য না থাকায় পণ্ডিতগণ এগুলি অগ্রাহ্য করেছেন।

ধর্মনিরপেক্ষ উৎপত্তিবাদ (Secular Origin)—

পুতুলনাচ (Puppet-play)--
Prof. Pischel সংস্কৃত নাটকের সূত্রধার, স্থাপক প্রভৃতি শব্দের উপর ভিত্তি করে বলেছেনপুতুলনাচ থেকেই সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত নাটকে নাট্যপরিচালককে বলা হয় সূত্রধার নাট্যবস্তু স্থাপন করায় তাঁকে স্থাপকও বলা হয় সূত্রধার শব্দের প্রকৃত অর্থ যিনি সূত্র ধারণ করেন নাটকের সঙ্গে পুতুলনাচের যোগ থাকলেও তা থেকে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছে এই তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য নয়

ছায়ানাটক (Shadow-play)—
Sten Konow, Luders প্রমুখ পণ্ডিতগণ ছায়ানাটক থেকে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তির কথা বলেছেন কিন্তু সংস্কৃতে যে কয়েক্টি ছায়ানাটক পাওয়া যায় তা সবগুলিই পরবর্তী কালের রচনা এবং নাটকের সঙ্গে এর কোন পার্থক্য নেই কাজেই এই মতটি অনুমান-নির্ভর Keith,  Hillebrandt প্রমুখ পণ্ডিতগণ এই মত খণ্ডন করেছেন

শক-প্রভাব
Sylvian Levy সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রে উল্লিখিত রাষ্ট্রীয়, স্বামী, ভদ্রমুখ প্রভৃতি ম্বদের উপর নির্ভর করে বলেছেন শক-প্রভাবের ফলে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছে কিন্তু এই মতবাদের কোন সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায় না

গ্রীক প্রভাব-- Weber, Windisch, Brandes প্রমুখ পণ্ডিতদের মতেগ্রীক প্রভাবের ফলে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি হয়েছে তাঁরা মূলতঃ গ্রীক নাটকে ব্যবহৃত যবনী, যবনিকা প্রভৃতি শব্দ এবং উভয় দেশের নাটকের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে এই মত পোষণ করেছেন কিন্তু Pischel. Levy, Schroeder প্রমুখ পণ্ডিতগণ এই মত খণ্ডন করেছেন

উপসংহার সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন উপাদান, প্রাচীন পণ্ডিতদের সিদ্ধান্ত এবং আধুনিক প্রাচ্য পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতদের বহুমুখী মতামত আলোচনা করে কোন সিদ্ধান্তকেই এককভাবে সংস্কৃত নাটকের উৎপত্তির মূল বলা যায় না তবে এটুকু বলা যায়বৈদিক সংবাদসূক্তগুলি নাট্যরচনার মৌল প্রেরণা বা বীজ তা থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় ও লৌকিক  অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃত নাটক প্রকৃত রূপ পরিগ্রহ করে যুগ যুগ ধরে সংস্কৃত সাহিত্যের রসধারাকে সমৃদ্ধ করেছে
-----

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1