ads

ad

Read more

বৈদিকযুগের বাস্তুশাস্ত্র--  বৈদিক সভ্যতা ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। ঋগ্বেদে এবং পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে ‘পুর’ কথাটির বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভবতঃ ‘দুর্গ’ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তৈত্তিরীয়সংহিতা (৬/২.৩.১), ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (১/২৩.২) এবং অন্যান্য গ্রন্থে মহাদুর্গের কথা বলা হয়েছে। ঋগ্বেদের একটি স্থানে (৪/৩০.২০) পাথরে তৈরি (অশ্মময়ী) দুর্গের কথা বলা হয়েছে। Macdonell  এবং Keith এর মতে এইগুলি ‘sun-dried bricks। গৃহ বোঝাতে ‘দম’, ‘বেশ্ম’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। শুল্বসূত্রগুলিতে গৃহ, চিতি ও বেদি নির্মাণের পরিকল্পনা ও পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে
পৌরাণিকযুগের বাস্তুশাস্ত্র— বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্নভাবে বাস্তুশাস্ত্রের কথা বলা হয়েছে। অগ্নিপুরাণে (অধ্যায়—১০৪-১০৫) গৃহ, অট্টালিকা ও প্রাসাদ-নির্মাণ, গরুড়পুরাণে (অধ্যায়—৪৬) গৃহ, উদ্যান, মঠ ও মন্দির-নির্মাণ; ভবিষ্যপুরাণে (অধ্যায়—১০৩) অট্টালিকানির্মাণ, মৎসপুরাণে (অধ্যায়—২২৫) স্তম্ভ, গৃহ ও অট্টালিকার পরিমাপ সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
বেদোত্তরযুগের বাস্তুশাস্ত্র—
খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর পূর্বেই ভারতবর্ষে নগরসভ্যতার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য নগরী হল-- অয্যোধ্যা, বারাণসী, চম্পা, কাম্পিল্য, কৌশাম্বী, মিথিলা, মথুরা, রাজগৃহ, সাকেত, শ্রাবস্তী, উজ্জয়িনী, বৈশালী প্রভৃতি। এই যুগের অট্টালিকা ইট ও কাঠ দিয়ে নির্মিত হত। তক্ষশীলা ও সাঁচির ধ্বংসাবশেষ দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ বলেছেন— ঐ সময়ে (খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক) গৃহনির্মাণের উন্নত প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্ত ছিল।
চন্দ্রগুপ্তের সময় (খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪-৩০০ শতক) নগরসভ্যতা অনেক সংহত অবস্থায় এসেছিল। প্রাক্‌মৌর্যযুগে কাঠের খুঁটি মাটিতে পুঁতে বাড়ি তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়। চন্দ্রগুপ্তের সময়েও এই পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে দুর্গনির্মাণের কথা আছে। চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে (৩৮০-৪১৩ খ্রীষ্টাব্দে) ভারতে এসে সম্রাট অশোকের প্রাসাদ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। অশোকের প্রাসাদ পাথর ও ইটের তৈরি ছিল। মৌর্যরাই প্রথম ভারতে Rock-cut architecture এর প্রবর্তন করেন। বৌদ্ধস্তূপ ও বিহারগুলি স্থাপত্যবিদ্যার উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
মধ্যযুগের বাস্তুশাস্ত্র—
ভারতবর্ষে বাস্তুশাস্ত্রের দুটি ধারা প্রবাহিত – আর্য ও অনার্য। আর্যধারার প্রধান আচার্য বিশ্বকর্মা। তিনি দেবতাদের স্থপতি। এই ধারার অন্যান্য আচার্যগণ হলেন— বিষ্ণু, সনৎকুমার, কাশ্যপ, নারায়ণ, শৌনক, গর্গ প্রমুখ।অনার্য ধারার মুখ্য স্থপতি ময়দানব। অন্যান্য আচার্যগণ—শুক্রাচার্য, নগ্নজিৎ প্রমুখ। 
বিশ্বকর্মার নামে প্রায় দশটি পুঁথি প্রচলিত। এর মধ্যে প্রধান হল— বিশ্বকর্মাবাস্তুশাস্ত্রম্‌। ময়দানবের নামে প্রচলিত গ্রন্থ—ময়মতম্‌।
বাস্তুশাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর বিবরণ—
বিশ্বকর্মাবাস্তুশাস্ত্রম্‌-- এই গ্রন্থের ৮১টি অধ্যায়ে গৃহনির্মাণ, গ্রাম ও নগরপত্তনের কিছু বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়েছে। এখানে গৃহনির্মাণের আরম্ভ-কালের পরীক্ষা, দিক্‌নির্ণয়, দ্রব্যসংগ্রহ, ভূ-পরীক্ষা, ভাবলক্ষণ প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে।
এছাড়া মন্দির-নির্মাণে আট প্রকার কাঠের ব্যবহার, দেওয়ালের প্রস্থ ও উচ্চতা, ভিতের গভীরতা, জানলা-দরজার পরিমাপ প্রভৃতি বিষয়ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচিত হয়েছে।
ময়মতম্‌ বা ময়বাস্তুশাস্ত্রম্‌--  এটি একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। পণ্ডিতগণের মতে— চোলদের আমলে গ্রন্থটি রচিত। এই গ্রন্থে স্থাপত্য ও অঙ্কনবিদ্যা সম্বন্ধে গভীর আলোচনা আছে। এখানে গৃহের পরিমাপ, চার ধরনের গৃহ, গৃহপ্রবেশ সংক্রান্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে।
সমরাঙ্গণসূত্রধার-- ৮৩ টি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত এই গ্রন্থের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়— নগর, প্রাসাদ, অট্টালিকা নির্মাণের নিয়ম ও পদ্ধতি।এছাড়া যন্ত্রনির্মাণের কৌশল এবং তাদের নামও দেওয়া হয়েছে। যেমন—গজযন্ত্র, ব্যোমচারী বিহঙ্গযন্ত্র, বীরপালযন্ত্র প্রভৃতি।
মানসার--  ৭০টি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত এই গ্রন্থে স্থাপত্যবিদ্যা, অঙ্কনবিদ্যা, মুর্তিনির্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা আছে।
শিল্পরত্নম্‌-- ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে পণ্ডিত টি. গণপতি শাস্ত্রী দুই খণ্ডে গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়--  স্থাপত্যবিদ্যা ও প্রতিমানির্মাণ-পদ্ধতি।
যুক্তিকল্পতরু--  ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র শাস্ত্রী গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এখানে ২৩টি অধ্যায়ে বাস্তুনির্মাণের বিষয় আলোচিত হয়েছে।
বৃহৎসংহিতা-- বরাহমিহিরের জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত এই গ্রন্থেও বাস্তুবিদ্যা ও প্রাসাদলক্ষণ আলোচিত হয়েছে।
মনুষ্যালয়চন্দ্রিকা--  ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে পণ্ডিত টি. গণপতি শাস্ত্রী-প্রকাশিত এই গ্রন্থে গৃহনির্মাণ-পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ-- 
গণপতিশিষ্যের বাস্তুতত্ত্ব, রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের বাস্তুযোগতত্ত্ব, চালুক্য সোমেশ্বরের মানসোল্লাস, শ্রীপতির রত্নমালা, শিবরামের লঘুশিপ্ল জ্যোতিসার, ভরদ্বাজের অংশুবোধিনী ও যন্ত্রশাস্ত্র, শ্রীনাথের বাস্তুমঞ্জরী, কাশ্যপের কাশ্যপসংহিতা, কাশ্যপশিল্পশাস্ত্র, মণ্ডনের প্রাসাদমণ্ডন, নারদের নারদশিল্পশাস্ত্র প্রভৃতি।
অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি (মাইসোর, বরদা, ত্রিবান্দ্রাম ও চেন্নাইয়ের ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরীতে রক্ষিত)—
১. বাস্তুমণ্ডন, ২. গৃহবাস্তুসার, ৩. নির্দোষবাস্তু, ৪. বিদ্যাচার্যের বাস্তুচক্র, ৫. ভোজদেবের বাস্তুশাস্ত্র, ৬. কেশব-রচিত বাস্তুতিলক, ৭. বাসুদেবের বাস্তুবিদ্যাপতি, ৮. বাস্তুবিধি, ৯. বাস্তুপদ্ধতি, ১০. কুমারবাস্তু।
উপসংহার— ভারতবর্ষে  আর্য ও অনার্যধারার মেলবন্ধনে বাস্তুশাস্ত্রের যে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমাদের সুপ্রাচীন প্রাসাদ, মন্দির প্রভৃতি এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন। আমরা ভারতবাসী হিসাবে আমাদের প্রাচীন সাহিত্য, দর্শন, নীতি-আদর্শের সঙ্গে বাস্তুবিদ্যার জন্য আমরা গর্ববোধ করতে পারি।

-----

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—