ads

ad

৩. নীতিশাস্ত্রম্‌ (C-9, Unit II)


৩. নীতিশাস্ত্রম্‌ (C-9, Unit II)

(কিং তাবৎ নীতিশাস্ত্রম্‌? অস্য বৈশিষ্ট্যমুল্লিখ্য ভারতীয়-নীতিশাস্ত্রাণাং বিবরণং দীয়তাম্‌।)

উত্তরম্‌-- ‘নীতিশাস্ত্র’ বলতে সাধারণভাবে নীতিবিষয়ক শাস্ত্র বোঝায়। এই নীতির ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক। পণ্ডিতগণের মতে--  রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, দণ্ডনীতি, বিভিন্ন বিষয়ে অনুসৃত সাধ্রণ নীতি (morals) প্রভৃতি সবই নীতিশাস্ত্রের অন্তর্গত। এই প্রসঙ্গে Prof. U. N. Ghoshal বলেছেন--  As regards the term Nītiśāastra', it is used in the narrow sense of the science of the polity as well as in the wider significance of the science of general morals.(The Cultural Heritage of India, Vol. II, page--451)

প্রাক্‌কৌটিল্য যুগের অর্থশাস্ত্র--  মহামতি কৌটিল্য তাঁর বেশ কয়েকজন পূরবাচারযের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন--  আচার্য ভারদ্বাজ, বিশালাক্ষ, বাহুদন্তীপুত্র, বাতব্যাধি প্রমুখ। এই সমস্ত আচার্যদের গ্রন্থে রাজনীতি, অর্থনীতি, দণ্ডনীতি প্রভৃতির আলোচনাই প্রধান। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—
পৈতামহতন্ত্র--  ব্রহ্মা-রচিত; বৈশালাক্ষতন্ত্র –আচার্য বিশালাক্ষ-রচিত;  বাহুদন্তকতন্ত্র –আচার্য ইন্দ্র-রচিত; বার্হস্পত্যতন্ত্র –আচার্য বৃহস্পতি-রচিত; উশনস্‌তন্ত্র – শুক্রাচার্য-রচিত।
ভারতীয় নীতিশাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের বিবরণ—

কামন্দকীয় নীতিসার--  কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে রচিত।লেখক কামন্দক সম্ভবতঃ খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে (মতান্তরে ৭ম-৮ম শতকে) মহাকাব্যের আকারে গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থে ২০টি সর্গ এবং ২৬টি প্রকরণ আছে।
কামন্দকীয় নীতিসারের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়—
প্রাচীন আচার্যের অধীনে রাজার ইন্দ্রিয়জয় ও নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষা, চতুর্বর্ণাশ্রমধর্ম, আচরণবিধি, রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গের রক্ষা, সমাজের অপরাধ দমন, রাজা ও রাজপুত্রের রক্ষা, রাজমণ্ডল, বিভিন্ন ধরনের চুক্তি, যুদ্ধাভিযান, কূটনীতিপ্রয়োগ, বন্ধুরাজাদের রক্ষা, নীতিবিচার, দূতনিয়োগ, গুপ্তচর-নিয়োগ, সাম-দান-দন্ড-ভেদ নীতিচতুষ্টয়ের প্রয়োগ, সৈন্যসমাবেশ, সেনা অভিযান, সৈন্যদের বিভিন্ন বিভাগের শক্তি ও দুর্বলতা, সেনাধ্যক্ষের কর্তব্য, বিভিন্ন ধরনের কূটযুদ্ধ প্রভৃতি। Winternitz কামন্দকীয় নীতিসারের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেছেন-- The Nītisara of Kāmandakī or Kāmandaka is not only a work of an altogether different kind. It is written not only in verse throughout, but in fact, it is intermediate between a text-book and a work of didactical poetry.

নীতিবাক্যামৃত--  জৈন আচার্য সোমদেব সূরি (৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) ৩২টি সমুদ্দেশে এই গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়—
ধর্ম, অর্থ, কাম, অরিষড়্‌বর্গ, বিদ্যাবৃদ্ধ, আন্বীক্ষিকী-ত্রয়ী-বার্তা-দণ্ডনীতি, মন্ত্রী, পুরোহিত, সেনাপতি, দূত, গুপ্তচর, বিচার, ব্যসন, রাজা, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোশ, বল, মিত্র, রাজ্যরক্ষা, রাজার প্রাত্যহিক কর্তব্য, সদাচার, প্রজাদের আচরণ, বিভিন্ন প্রকার বিবাদ, ছয় প্রকার বৈদেশিক নীতি (ষাড়্‌গুণ্য), যুদ্ধ প্রভৃতি।
সোমদেব মূলতঃ কৌটিল্যকেই অনুসরণ করেছেন। কামন্দকের মতো তিনিও শাসনসংক্রান্ত আলোচনা পরিহার করে রাজাদের অনুসরণীয় প্রজাপালন-বিষয়ক নীতির আলোচনাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। নীতিবাক্যামৃতের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে Winternitz বলেছেন--  It is not like the Arthaśāstra of Kauilya, a practical hand-book of politics and economics, but it is rather a pedagogical work that contains fine counsels for the king.

শুক্রনীতিসার--  কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রকে অবলম্বন করে রচিত আর একটি গ্রন্থ শুক্রনীতিসার মধ্যযুগের জনৈক শুক্রাচার্য এই গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে চারটি অধ্যায় আছে এবং সর্বশেষ অধ্যায়ে সাতটি প্রকরণ আছে। এই গ্রন্থের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়—
রাজপুত্র এবং রাজার কর্তব্যকর্ম, রাষ্ট্রের অন্যান্য পদাধিকারিকদের কর্তব্য, রাজা ও তাঁর অনুসরণীয় নীতিসমূহ, রাজার মিত্রদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, রাজকোষ, বিজ্ঞান ও কলাবিদ্যা, প্রথা ও প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন প্রকার দুর্গ, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্রীয় পরিষদ, মন্ত্রী, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ, বিচারব্যবস্থা, আন্তঃরাষ্ট্রনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যা, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, আচরণবিধি, নীতিশিক্ষা, বিভিন্ন ধরনের বিদ্যা, কথা, সাহিত্য, অর্থনীতির বিষয়সমূহ--  পরিসংখ্যান, মূল্য, মজুরী প্রভৃতি।
শুক্রনীতিসারে  রাজনীতি, অর্থনীতি, সাধারণ নীতি এবং সামাজিক বিষয়সমূহ আলোচিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে একে Socio-political এবং Socio-economic শ্রেণীর রচনা বলা যায়।শুক্রনীতিসারের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে Prof. U. N. Ghoshal বলেছেন--  It may be said that the Śukra-Nītisāra is a socio-political and socio-economic work. It combines in itself the most the salient features of Arthaśāstra and Dharmaśāstra, and even of Kāma-śātra, to the exclusion of Moka-śāstra.
লঘ্বন্নীতিশাস্ত্র— জৈন আচার্য হেমচন্দ্র (১০৮৮-১১৭২ খ্রিষ্টাব্দ) এই গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি প্রাকৃত ভাষায় রচিত ‘বৃহদর্হন্নীতিশাস্ত্র’ গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে লেখা।গ্রন্থটি শ্লোকাকারে লেখা, মাঝে মাঝে গদ্যরচনাও আছে। গ্রন্থের অল্প অংশ রাজনীতি-বিষয়ক এবং অধিকাংশ শাসননীতি ও দণ্ডনীতি-বিষয়ক আলোচনায় পূর্ণ।

নীতিসূত্র--  আচার্য বৃহস্পতি-রচিত এই গ্রন্থটি ‘বার্হস্পত্যনীতিসূত্রাণি’ নামেও পরিচিত। ছোট ছোট বাক্যে গ্রন্থটি রচিত। এখানে নীতিশাস্ত্রের প্রায় সমস্ত বিষয়ই আলোচিত হয়েছে। গ্রন্থটি সম্ভবতঃ ষষ্ঠ-সপ্তম খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে রচিত হয়েছিল। লেখকের মতে--  ‘ধর্মমূলং চ বিদ্যামর্জয়েৎ’। তিনি আর বলেছেন-- রাজাকে ধর্ম ও অর্থ উভয় বিষয়েই চিন্তা করতে হবে--  ‘ব্রাহ্মমুহূর্তে উত্থায় ধর্মার্থান্‌ চ চিন্তয়েৎ’।

নীতিপ্রকাশিকা--  বৈশম্পায়ন-রচিত এই গ্রন্থের কাল সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না। আটটি সর্গে এখানে অর্থশাস্ত্র, কামন্দকীয় নীতিসার, হরিহরচতুরঙ্গ, সংগ্রামবিজয়োদর প্রভৃতি গ্রন্থের বিষয়গুলি আলোচিত হয়েছে। এখানে অর্থনীতি ও দণ্ডনীতি বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে।

রণদীপিকা--   খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের মধ্যভাগে কুমারগণক এই গ্রন্থটি রচনা করেন। এখানে আটটি অধ্যায়ে ধনুর্বেদ, অর্থশাস্ত্র, জ্যোতিষ, স্বরাগম, পক্ষিশাস্ত্র এবং যুদ্ধাভিযানের উৎকৃষ্ট সময় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

রাজনীতিরত্নাকর--  মিথিলারাজ হরিসিংদেবের সভাকবি চণ্ডেশ্বর রচিত ধর্মশাস্ত্র-নিবন্ধমূলক। লেখকের মতে--  রাজা বলতে শুধু ক্ষত্রিয়কেই বোঝায় না, রাজ্যের আনুষ্ঠানিক রক্ষাকর্তাকেই রাজা বলে।

অন্যান্য গ্রন্থ--  উপরে উল্লিখিত গ্রন্থগুলি ছাড়াও পণ্ডিত Winternitz ধনুর্বেদ, হস্তিবিদ্যা, অশ্ববিদ্যা, স্থাপত্যনীতি প্রভৃতি বিষয়ক গ্রন্থগুলিকেও নীতিশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল--  সিদ্ধশ্রীকণ্ঠশম্ভুর নিধিপ্রদীপ, তেলেগু ভাষায় সঙ্কলিত সকলনীতিসম্মতম্‌, ঋষি বিশ্বামিত্র সঙ্কলিত ধনুর্বেদ, জয়দত্ত সূরির অশ্ববৈদ্যক, নকুল-রচিত অশ্বচিকিৎসা, ভোজ-রচিত শালিহোত্র, পালিকাপ্য-রচিত  হস্ত্যায়ুর্বেদ, নীল্কণ্ঠ-রচিত মাতঙ্গলীলা, রাজা রুদ্রদেবের সৈনিকশাস্ত্র প্রভৃতি।

স্থাপত্যনীতি সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ--  চালুক্যরাজ ভূলোকমল্লের নামে প্রচলিত অভিলষিতার্থচিন্তামণি বা মানসোল্লাস, কাশ্যপের নামে প্রচলিত কাশ্যপশিল্পম্‌, ভুবনদেবের অপ্রাজিতপৃচ্ছা, মণ্ডনের নামে প্রচলিত প্রসাদমণ্ডন প্রভৃতি।

উপসংহার--  নীতিশাস্ত্রের গ্রন্থগুলির বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এখানে মূলতঃ রাজনীতি, অর্থনীতি, রাজা এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গ সম্বন্ধে রাজার অনুসরণীয় নীতি, সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষের জীবনযাত্রা-বিষয়ক নীতি প্রভৃতিই গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে। গ্রন্থগুলির বেশীর ভাগই তাত্ত্বিক আলোচনায় পূর্ণ।  শাসকগণ বা অন্যান্য ব্যক্তিগণ সেগুলি কতটা মেনে চলতেন সেই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়--  উক্ত নীতিগুলি সুস্থ ও সম্পন্ন সমাজ গড়ার দিকে লক্ষ রেখেই উপদিষ্ট হয়েছিল। মূল্যবোধের বিচারে এগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

----

Comments

Ads

Popular

১. প্রাচীনভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র (Medical Science), ২. বাস্তুশাস্ত্রম্‌ (C-8, Unit II: Scientific and Technical Literature)

বহুল ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ—

3rd Sem, SEC-1, Usage of words in day-to-day life-1